সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

| ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

সিএনএনের বিশ্লেষণ

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বড় বাধা দিল্লি 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০:৫০, ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০১:৫৭, ২৫ নভেম্বর ২০২৫

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বড় বাধা দিল্লি 

শেখ হাসিনা/ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর। এমন মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আদালতে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকার আনুষ্ঠানিক আহ্বান থাকলেও, নয়া দিল্লি রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক জটিলতা বিবেচনা করে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সময় দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মুখ হিসেবে বিবেচিত শেখ হাসিনার উত্থান যতটা নাটকীয়, পতনও ততটাই অভাবনীয়। ২০২৪ সালের ছাত্র–নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত বছরের আগস্টে তিনি ভারতের রাজধানীতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।

এক ‘শেক্সপীয়রীয়’ রাজনৈতিক যাত্রা

সিএনএন লিখেছে, শেখ হাসিনার জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়ানো। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে তার শৈশব–যৌবন রাজনীতির আঙিনাতেই কেটেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সামরিক অভ্যুত্থানে তার বাবা–মা–ভাইসহ পরিবারকে হত্যার পর তিনি ও তার বোন ঢেউয়ের মতো নির্বাসিত জীবনে ছিটকে যান ভারতে। ছয় বছর পর দেশে ফিরে তিনি দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগের। এরপর শুরু হয় ‘ব্যাটেলিং বেগমস’—হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রায় তিন দশকব্যাপী রাজনৈতিক লড়াই, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই মেরুতে ভাগ করে দেয়।

১৫ বছরের ক্ষমতা, উন্নয়ন—এবং কঠোর শাসনের অভিযোগ

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর দেশজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দলের দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বার হাসানের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে এত রক্তপাত ঘটিয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত জনগণের ক্ষোভ তাকে বহন করতে পারেনি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনিয়ম, সহিংসতা ও বিরোধীদের দমন–পীড়নের অভিযোগের পর প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি ও নিরাপত্তা অপারেশন আরও কঠোর হয়। তথাপি শক্ত হাতে দেশ চালানোর ফলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, পানিনীতি ও জ্বালানি–বাণিজ্যে দিল্লি–ঢাকা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।

যে আন্দোলনে ভেঙে পড়ে ১৫ বছরের শাসন

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র বিক্ষোভ তিন সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ণমাত্রার গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারের কঠোর দমন–পীড়নে পরিস্থিতি রক্তাক্ত মোড় নেয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা জানায়, ওই দমনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়। কিন্তু রক্তপাত দমন নয়—আরও তীব্র প্রতিরোধ তৈরি করে। আন্দোলনের চাপে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।

অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার ও মৃত্যুদণ্ড

ঢাকায় গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ড ‘উসকে দেওয়া, হত্যার নির্দেশ দেওয়া, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে শক্তি প্রয়োগের আদেশ দেওয়া’ ইত্যাদি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।

রায়ের পর আদালতে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যরা হাততালি দিয়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। এক শহীদ পরিবারের বাবা সিএনএনকে বলেন, “এটা কিছুটা শান্তি দিয়েছে। কিন্তু সত্যিকারের শান্তি পাব যখন তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে দেখব।”

ভারতের কাছে এখন বড় প্রশ্ন: তাকে কি ফিরিয়ে দেবে?

ভারত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরযোগ্য দেশ হলেও বিষয়টি রাজনৈতিক জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে। দিল্লি জানিয়েছে, তারা ‘রায় নোট করেছে’ এবং ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করবে’।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েতকে উদ্ধৃত করে সিএনএন বলেছে, দিল্লি খুব একটা সম্ভাবনা দেখছে না যে তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে। কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে—

১. রাজনৈতিক অপরাধ ব্যতিক্রম
বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে রাজনৈতিক কারণে অভিযুক্তদের ফেরত না দেওয়ার ‘পলিটিক্যাল অফেন্স এক্সসেপশন’ আছে। ভারত চাইলে বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখাতে পারে।

২. সব আইনি পথ এখনও শেষ হয়নি
ত্রিগুনায়েত বলেন, শেখ হাসিনা চাইলে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট, পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও ( আইসিসি) আপিল করতে পারেন। তাই দিল্লি ‘তাড়াহুড়া করবে না’।

৩. নিরাপত্তা বিবেচনা
শেখ হাসিনার পতনে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর পুনঃউত্থান নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন; তার প্রতি ভারতের ব্যক্তিগত আস্থার ইতিহাসও বড় বিষয়। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “ভারত এসেন্সিয়ালি আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।”

ঢাকার চাপ বাড়ছে

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে—“বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।”

কিন্তু ভারত—কমপক্ষে আপাতত—নীরব।

রাজনীতি আরও কঠিন মোড়ে

ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে নিষিদ্ধ; নেতৃত্ব ছড়ানো–ছিটানো। সাবেক নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গভীর রাজনৈতিক মেরূকরণ থেকে বের করার কঠিন কাজ করছে।

বিএনপি ও ছোট দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক মাঠ আপাতত খোলা থাকলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন—বাংলাদেশ এখনো “সমঝোতা থেকে অনেক দূরে।”

সিএনএন মন্তব্য করেছে, শেখ হাসিনা এখন আর শুধু একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতা নন; তিনি ভারত–বাংলাদেশ ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দিল্লির রাজনৈতিক ইচ্ছা ও আঞ্চলিক হিসাব–নিকাশের ওপর।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

‘আর.ভি ড. ফ্রিডটজফ নানসেন’ জরিপ; বঙ্গোপসাগরে ৬৫ নতুন প্রজাতির মাছ, বাংলাদেশ অংশেই ৫ প্রজাতি
অবৈধ আহরণে সমুদ্রে কমে যাচ্ছে মাছ: ফরিদা আখতার
খালেদা জিয়ার সুস্থতায় ঢাবিতে ছাত্রদলের দোয়া মাহফিল
বিএনপির হাতেই দেশের সার্বভৌমত্ব: মির্জা আব্বাস
১৭০ আসনে জেএসডির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ: দেখে নিন প্রার্থী কারা
ছাদে দুই কিশোর, বন্ধ মেট্রোরেল চলাচল
সরকারি প্লট বরাদ্দ দুর্নীতি মামলা : শেখ হাসিনা, রেহানা ও টিউলিপের বিরুদ্ধে মামলার রায় সোমবার
হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিলো: তদন্ত কমিশন
নারায়ণগঞ্জে বাউলদের সমাবেশ মঞ্চের ফেস্টুন ছিঁড়ল যুবক, আটক
তারেক রহমান ঢাকায় না থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, এটা ঠিক না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
সীমান্ত হত্যার সমাধান আপাতত দেখছি না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের
বিজয়ের মাসজুড়ে শিল্পকলায় যাত্রাপালা প্রদর্শনী, ৩১ টি দল থাকবে
কামালকে প্রত্যর্পণের তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেই: উপদেষ্টা
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত,
সচিবালয়ের আগুন নিভেছে
ফিরতে চাইলে তারেক রহমানকে ওয়ান-টাইম পাস দেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
খুলনায় আদালত চত্বরে গুলিতে নিহত ২
১ ডিসেম্বর থেকে রাত্রে থাকা যাবে সেন্টমার্টিনে
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় রাশিয়ার শুভেচ্ছা–বার্তা