শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

ইতিহাসে বাংলাদেশে যতো ভয়াবহ ভূমিকম্প 

বিশেষ প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ১৭:৪৬, ২১ নভেম্বর ২০২৫

ইতিহাসে বাংলাদেশে যতো ভয়াবহ ভূমিকম্প 

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত

বিগত বছরগুলোতে দেশে স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার বেশকিছু ভূমিকম্প হয়েছে। এতেই দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি ঘটেনি। তবে আজ শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভবনে ফাটল, রেলিং ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

আতঙ্কিত মানুষ। অজানা আশঙ্কা মনে। কবে আবার ভূমিকম্পের ভয়াবহ তাণ্ডবের মুখে পড়তে হয়। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত মানুষ। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় বিশ্লেষকেরা বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতেও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। 

নিকট অতীতে বড় কোনো ভূমিকম্প না হলেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ঘেটে বাংলাদেশে যতো ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে, তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি অনুযায়ী ক্রম সাজানো হয়েছে।

১৫৪৮ ও ১৬৪২ সালের দুটি ভূমিকম্প
দেশের ভূখণ্ডে প্রথম বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে ১৫৪৮ সালে। এতে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ফেটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা-পানি বেরোনোর তথ্য পাওয়া গেলেও ভূমিকম্পে বর্ণনায় হতাহতের কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ হয়নি। ১৬৪২ সালে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে সিলেট জেলার অনেক দালান-কোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেবারও মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

১৭৬২ ও ১৯০৮
দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ভূমিকম্প হয় ১৭৬২ সালের এপ্রিল মাসে। ১৯০৮ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম জেলার অনেক জায়গায় মাটি ফেটে প্রচুর পরিমাণে কাদা-পানি ছিটকে বেরোয়। ‘পর্দাবন’ নামক জায়গায় একটি বড় নদী শুকিয়ে পড়ার বর্ণনাও পাওয়া যায় তখন। ‘বাকর চনক’ নামের এক অঞ্চলের প্রায় ২০০ মানুষ তাদের গৃহপালিত প্রাণীসহ পুরোপুরি নিমজ্জিত হয় সমুদ্রগর্ভে। মিথ আছে, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে দুটি আগ্নেয়গিরি উৎপন্ন হয়েছিল সেই ভূমিকম্পের প্রভাবে। যদিও পরবর্তীতে আর চিহ্নিত করা যায়নি নির্দিষ্ট নামে বর্ণিত সেই স্থানগুলোকে। 

১৭৬২ ও ১৯১২
১৭৬২ সালের এই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকাতেও ভয়াবহ ভূকম্পনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে ১৯১২ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’তে। জেমস টেইলরের ‘আ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’র বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন নদী আর ঝিলের পানিতে প্রবল আলোড়ন দেখা গেছে সেই ভূমিকম্পের সময়ে। পানির স্তরও সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি উঁচু হয়ে গিয়েছিল। ভূকম্পন শান্ত হলে পানি নিচে নেমে যাওয়ার পর অসংখ্য মরা মাছ ছড়িয়ে ছিল জলাশয়ের পাড়ে। ভূপৃষ্ঠের প্রবল আলোড়নের পাশাপাশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ভূগর্ভস্থ শব্দ। অসংখ্য বাড়িঘর ভেঙে পড়েছিল ভূমিকম্পের ফলে। প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৫০০ মানুষ।

১৭৭৫ ও ১৮১২
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’র একই সংখ্যায় পাওয়া যায় ১৭৭৫ ও ১৮১২ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের বর্ণনা। ১৮১২ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বেশ কিছু ঘরবাড়ি আর দালান-কোঠা। বাংলাপিডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, ১৭৭৫ সালের ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলে আর ১৮১২ সালের ভূমিকম্পটি হয়েছিল সিলেটে। তবে উভয় ভূমিকম্পেই হতাহতের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি।

১৮৬৫ ও ১৯১২
১৮৬৫ সালের শীতকালে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯১২ সালের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’এ। সীতাকুণ্ডের এক পাহাড় ফেটে বালি আর কাদা বেরোয় সেই সময়। তবে আর কোনো গুরুতর ক্ষতির তথ্য মেলেনি এই ভূমিকম্পে।

১৮৮৫
১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জে আঘাত হানা প্রায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি পরিচিত ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’ নামে। এর সম্ভাব্য উপকেন্দ্র ছিল ঢাকার ১৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী সাটুরিয়ার কোদালিয়ায়। এই ভূমিকম্পের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে ভারতের বিহার, সিকিম, মণিপুর ও মিয়ানমারেও অনুভূত হয়েছিল কম্পন। ঢাকা, ময়নমনসিংহ, শেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জের অনেক দালানকোঠা, স্থাপত্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেবার। তবে এতে প্রাণহানীর কোনো সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

১৮৯৭ ও ১৯২৩
১৮৯৭ সালের ১২ জুন সংঘটিত বিধ্বংসী ভূমিকম্পটি পরিচিত ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ধারণা করা হয় প্রায় ৮। ১৯২৩ সালের ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার পাবনা’য় বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে সিরাজগঞ্জে উপবিভাগীয় অফিসের উপরের তলা, কারাগার, ডাকঘরসহ নানা স্থাপনা ধ্বংস হয়। প্রায় সকল দালান স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভীষণভাবে। অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোং এর পাটের ব্যাগের ফ্যাক্টরি ধূলিসাৎ হয়ে যায় এই ধাক্কায়। কোম্পানিটি তাদের ব্যবসাই গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় এরপর। পাবনার কোর্ট হাউজসহ অন্যান্য ইটের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূপৃষ্ঠের নানা স্থানে চির ধরে, অনেক কূয়া পরিপূর্ণ হয় ভূ-তল থেকে উঠে আসা পলিমাটি আর বালিতে।

১৮৯৭
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’ থেকে জানা যায়, ১৮৯৭ সালের এই ভূমিকম্পটি পূর্বে দক্ষিণ লুসাই পর্বতমালা থেকে শুরু করে পশ্চিমে শাহাবাদ পর্যন্ত সমগ্র বাংলা জুড়ে অনুভূত হয়েছিল। যার সম্ভাব্য মূলকেন্দ্র ছিল আসামের চেরাপুঞ্জির কাছাকাছি। ভূমিকম্পের স্থায়ীত্বকাল ছিল জায়গাভেদে ছয় সেকেন্ড থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত। চট্টগ্রামে স্থায়ী ছিল সবচেয়ে বেশি সময় ধরে। ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’র তথ্য মতে, উক্ত ভূমিকম্প ঢাকা শহরের অনেক উল্লেখযোগ্য স্থাপনার ক্ষতিসাধন করেছিল। সে তুলনায় প্রাণহানীর সংখ্যা ছিল বেশ কম। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনাগুলোর মেরামত বাবদ সেসময় খরচ হিসাব করা হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ রূপি।
বাংলাপিডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে শুধু সিলেট জেলাতেই মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৪৫। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল ও সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয় এর কারণে। রাজশাহীসহ পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য জেলাও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনকার হিসাবে শুধু অর্থ-সম্পত্তির ক্ষতিই হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

১৯৫০, ১৯৯৭ ও ১৯৯৯
১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট আঘাত হানে আসাম ভূমিকম্প। বিংশ শতকের অন্যতম ভয়ানক এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.৭। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হলেও তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ১৯৯৭ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল ধরে। ২০ শতকে দেশের শেষ বড় ভূমিকম্প হয় মহেশখালী দ্বীপে। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসের ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিলো মহেশখালী দ্বীপেই। দ্বীপের ঘড়বাড়ি ক্ষত্রিগ্রস্ত হয়েছিলো, ৫.২ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান
ইন্দোনেশিয়ায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে