হলমার্ক দুর্নীতি, এমডি তানভীর ও এক গরিবের মেয়ের বিয়ে
প্রকাশ: ০৩:৪৬, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
আরিফ জেবতিক
দেখলাম, হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। তুলনামূলক কম বয়সেই মারা গেছেন। কেউ মারা গেলে সাধারণত তাকে নিয়ে খারাপ কথা বলাটা সবারই বিবেকে বাধে। তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, তানভীরের মৃত্যুর খবরে একধরনের আরামই পেয়েছি বলা চলে। মনে মনে ভাবলাম, চার হাজার কোটি টাকা মেরে কী লাভ হলো, শেষ পর্যন্ত টাকা তো ভোগ করতে পারলি না, জেলেই মারা গেলি।
হলমার্ক ছিল বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক লুট শুরুর এক অনন্য ইতিহাস। আগে সাধারণত লোকজন ব্যাংক ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে যেত। কিন্তু হলমার্কের সময় থেকে শুরু হলো যে একেবারে জাস্ট কাগজে-কলমে লুটপাট করা। সোনালী ব্যাংকের একটা শাখায় ভুয়া এলসি দিয়ে সেটাকে ক্যাশ করা। শাখার পাশেই জালিয়াতির জন্য রীতিমতো অফিস খুলে বসেছিল হলমার্কের মালিক। বিষয়টি যখন ব্যাংকের হেড অফিসের কিছু সৎ ও বোকা টাইপের কর্মকর্তারা টের পেয়ে তদন্ত করতে গেলেন, তখন সেই তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী নিজে ছুটে গিয়েছিলেন ব্যাংকের শাখায়। গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিজের বিজনেস কার্ড দিয়ে এসেছিলেন।
তাদের কপালের দোষ যে শেষ পর্যন্ত ব্যাপক হাউকাউ হওয়ায় হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীরের যাবজ্জীবন জেল হয়েছিল। যদিও বিচারক বলেছিলেন যে আইনে থাকলে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া উচিত ছিল তানভীরকে। মোদাচ্ছের আলী কোথায় আছেন জানি না, উনাকে প্রথমে দুদকে ডাকা হবে বললেও পরে স্বাভাবিকভাবেই আর এই মামলায় উনার নাম ছিল না। এখনকার প্রেসিডেন্ট, তখনকার দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মিডিয়ার সামনে এসে বলেছিলেন, ‘হলমার্ক কেলেঙ্কারির প্রধান হোতা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদসহ পুরো পরিবারের সঙ্গে ডা. মোদাচ্ছের আলীর সম্পর্ক থাকলেও তিনি কোনো আর্থিক লেনদেনে জড়িত ছিলেন না। যে কারণে তার নাম মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে আসেনি।’
সিস্টেমেটিক ব্যাংক লুট তারপর সর্বগ্রাসী হয়েছে। যে ইসলামী ব্যাংককের বিরুদ্ধে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগের কারণে সেটিকে শুদ্ধ করার জনদাবি উঠেছিল, পাবলিকের সেই ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী ব্যাংক উদ্ধারীকরণের নামে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়েছিল। তারপর এত স্বাস্থ্যবান একটা ব্যাংককেও ছিবড়ে রস বের করে চুরি করে ফেলতে বেশি দিন লাগায়নি এস আলম। এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সাহেবকে দেখতাম, কী সুন্দর ইসলামী লেবাস; দেখতে ফেরেশতার মতো লোক; বিপদে-আপদে গিয়েই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১০০ কোটি টাকার একেকটা চেক দিয়ে দেন ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে। সেই এক্সিম ব্যাংক এখন ৫ হাজার টাকার চেক অনার করতে পারে না। পুরো ভেতর খেয়ে ফেলেছে।
এরকম একাধিক ব্যাংকে মানুষ অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে। বিশেষ করে আমি অনেক মানুষকে চিনি যারা রিটায়ারমেন্টের টাকা জমা রেখে এখন অর্ধাহারে-অনাহারে আছেন। কারণ ব্যাংক তাদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। আমার গ্রামের এক গরিব আত্মীয়া যিনি মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য তিলে তিলে টাকা জমিয়েছিলেন, প্রবাসী আত্মীয়দের কাছ থেকে দান-অনুদান নিয়েছিলেন, তার পুরো ৪ লাখ টাকা এরকম একটি ব্যাংকে আটকে আছে। আগামী মাসে মেয়ের বিয়ে, উনি কী করবেন জানেন না। ধারের জন্য এখানে-ওখানে হাত পাতছেন। উনার সামাজিক অবস্থানে তো ৪ লাখ কেন, ৪০ হাজার টাকা ধার পাওয়াটাও মুশকিল।
হলমার্কের এমডির মৃত্যুর খবরের আত্মতৃপ্তি তাই অনেকখানিই অক্ষমের সান্ত্বনা পাওয়ার মতো। মনে হয় আল্লাহ যদি ঠাটা ফেলে এস আলম আর তার চৌদ্দগুষ্টিকেও এভাবে ধ্বংস করে দিতেন, কতই না ভালো হতো!
লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
