শিক্ষকের কী ক্ষমতা!
প্রকাশ: ২১:২৭, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন।
চব্বিশের গণঅভ্যুথানের আগে আমার ক্যাম্পাসে দেখেছি, এক দল শিক্ষকের কী ক্ষমতা! সেটা ছিল নীল দলের রাজত্ব। শুনেছি তখন তাদের কোনো মিটিং হলে সেই মিটিংয়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। কে কোথায় বসবে, কাকে কোন পদ দেওয়া হবে-সবকিছুই সেই গোষ্ঠী নির্ধারণ করত। ক্ষমতার কেন্দ্রে তারা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, তাদের সিদ্ধান্ত ক্যাম্পাসের পুরো একাডেমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করত। এরা কেউ রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতো না। গ্রুপিং হওয়ার জন্য শিক্ষকদের একত্রিত হওয়ার জন্য যেই আকর্ষণ বলের দরকার সেটা আসতো ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের হিসাব থেকে।
কিন্তু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন ক্যাম্পাসে আরেক গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিদিনই দৃশ্যমান। সব পদ-পদবি তাদের নিয়ন্ত্রণে, মিটিং ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষকের অভাব হয় না। এখনো সেই আগের আকর্ষণ বল। অভ্যুত্থানের কারণে মানুষের চেহারা বদলেছে কিন্তু কাজ এবং কাজের ধরন একটুও বদলায়নি। যে শিক্ষকরা আগে নীল দলের “সফ্ট” সমর্থক ছিলেন, এখন তারা নীরবে নতুন ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে সেই স্রোত আরও বাড়বেই-এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তব ছবি। আজ নীল দল পরিচয় যেন লজ্জা বা ভয়-কেউ আর স্বীকার করতে চায় না।
প্রশ্ন হলো: তারা কি উচ্চশিক্ষিত নন? সমাজ গড়ার কারিগর নন? তাহলে ব্যক্তিগত লাভের ইন্ধনে কীভাবে এরা এত সহজে চালিত হন? দেশ, আদর্শ, শিক্ষা-এগুলোর মূল্য যেন ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার নিচে চাপা পড়ে গেছে। দেশের শিক্ষা কোন দিকে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে নৈরাজ্য, অনিশ্চয়তা ও হতাশা জন্ম নিচ্ছে-এসব নিয়ে যেন কারও মাথাব্যথাই নেই। ছাত্রছাত্রীদের মানসিক সুস্থতা, গবেষণার পরিবেশ, একাডেমিক মান-কোনো কিছুই তাদের অগ্রাধিকারে নেই। গত দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের সত্যিকারের সিস্টেমের কোন পরিবর্তন হয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ক্ষমতা যে এক বিন্দুতে তার কোনো পরিবর্তন হয়েছে? তাহলে অভ্যুথান হয়ে কি লাভ হলো?
অন্যদিকে, দেশের জাতীয় রাজনীতিতে যেমন বিভাজনের রাজত্ব চলছে, তেমনি শিক্ষকদের মধ্যেও inter-party এবং intra-party কোন্দল প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। দল-দলান্তরের বিরোধ, দলের ভেতরের গ্রুপিং-কাঁদাছোড়া, অপপ্রচার, মারামারি, হানাহানি-এসব আজ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে স্থানে জ্ঞান, যুক্তি ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ অবকাশ থাকার কথা, সেখানে ক্ষমতার লোভ, স্বার্থান্ধতা এবং পক্ষপাতিত্ব জেঁকে বসেছে।
শিক্ষকদের কাজ কি সমাজের এনট্রপি কমানো না বাড়ানো? শিক্ষকদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত সমাজের বিশৃঙ্খলা-অর্থাৎ সামাজিক ‘এনট্রপি’-কমানো, দিকনির্দেশনা দেওয়া, ভবিষ্যৎ নাগরিককে নৈতিক শক্তি প্রদান করা। শিক্ষক সমাজ যদি নিজেরাই বিভক্ত হন, আদর্শহীন হন, ক্ষমতার লোভে চালিত হন—তবে সমাজের এনট্রপি কমবে কীভাবে? বরং অরাজকতা বেড়েই চলে। ছাত্ররা দেখে: মতাদর্শ নয়, নৈতিকতা নয়—পাওয়ার পলিটিক্সই বাস্তবতা।
শিক্ষকরা যখন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর যন্ত্রে পরিণত হন, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার মূল উদ্দেশ্য হারায়। বিশ্ববিদ্যালয় আর জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতা পাল্টানোর বড় ঘুঁটি। বাংলাদেশ এগোবে তখনই, যখন শিক্ষক সমাজ নিজেদের আন্তঃদ্বন্দ্ব, দলীয় স্বার্থ আর গোষ্ঠীক্ষমতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর স্বার্থ-শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ-প্রাধান্য দেবে। শিক্ষকই যদি স্থিতিশীলতার মানসিকতা তৈরি না করেন, তবে শিক্ষার্থী থেকে সমাজ—কারও পক্ষে পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
