‘ফ্যাসিস্টের দোসর’, আর ‘লাল বদর’ বলেন; সত্যটুকু কিন্তু বলেই যাব
প্রকাশ: ০৪:২৫, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
মঞ্জুরুল আলম পান্না
বারবার একটা কথা বলি, যে সমাজ বা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার পরের স্টেইজ হচ্ছে জঙ্গিবাদ বা চরমপন্থা। এখন তারই এক উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে পুরো দেশ। চরম রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ নিজে। যারা তখন শেখ হাসিনার কোনো ভুল ধরতে চাননি, হাতে তসবি নিয়ে দিন-রাত কেবল ‘হায় হাসিনা, হায় হাসিনা’ বন্দনা করে গেছেন, আওয়ামী সরকারের পতনের জন্য এই অন্ধ দালাল গোষ্ঠীই দায়ী সবচেয়ে বেশি।
সুযোগ পেয়ে এখন অনেকে আমাকে, ‘লাল বদর’ আখ্যা দিয়ে মনে মনে অন্যরকম এক সুখ অনুভব করছেন। তাদের কাউকে আমি এই সুখ থেকে বঞ্চিত করতে চাই না। যেমন ইচ্ছে বলুন, বলতে থাকুন। বছরের পর বছর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, বাকস্বাধীনতা হরণ, লুটপাট, দুর্নীতি, টাকা পাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে ‘বিএনপি-জামায়াতের দালাল’ বানানো হয়েছে। পেশাগত জীবনে শেষ ১০ বছর অনেক ধরনের খেসারত দিতে হয়েছে। তবু সত্য উচ্চারণে পিছপা হইনি। এ কথাও সত্য যে, একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃততভাবে একটা গণতান্ত্রিক সরকারের দাবির পক্ষেও সোচ্চার ছিলাম।
দলান্ধ কিছু মানুষের ভাবটা এমন যে, হাসিনা সরকারের সমালোচনা করেছি বলেই তার পতন ঘটেছে। কিন্তু এই মানুষগুলো একবারের জন্যও ভাবে না—সাড়ে ১৫ বছরের নানা ধরনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ থেকে লাখো মানুষ নেমে এসেছিল ২৪–এর ৫ আগস্ট। এমনকি অসংখ্য আওয়ামী পরিবারের অসংখ্য সদস্যও ছিলেন সেই রাজপথে। সেই আন্দোলনের মেটিকুলাস ডিজাইনকারীরা কোনোভাবেই সফল হতো না যদি কিনা ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষেরা রাজপথে না নামতেন। পেছনের নীল নকশাকারীরা তাদের আবেগকে পুঁজি করেই সফল হয়েছে দারুণভাবে।
আওয়ামী লীগের পতনের জন্য আওয়ামী লীগ নিজেই দায়ী। শুধু তাই নয়। হাটে-ঘাটে বঙ্গবন্ধুকে বিক্রি করে, যত্রতত্র মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করে আমার অস্তিত্বের শেকড় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে দালাল-সুযোগসন্ধানী-উচ্ছিষ্টভোগীরা। সেই তারাই এখন আবার আমার মতো অনেককে বলছেন ‘লাল বদর’। দলকানা-অন্ধ সমর্থকদের ভাবখানা এমন যে আওয়ামী লীগ যাই করে যাচ্ছিল বিরোধী শক্তির হাতে দেশ যাতে না যায় সে জন্য আওয়ামী লীগের সব অপকর্মকেই সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। কী অদ্ভুত!
সত্য উচ্চারণ করতে গিয়ে আবার ইউনূস সরকারের রোষানলে পড়েছি, ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ উপাধি নিয়ে ‘সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রকারী’ তকমা গায়ে মেখে কারাগারে যেতে হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনে বিচারকদের সামনে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য, আমি নাকি সশস্ত্র বিপ্লবকারীদের একজন। শুনুন, স্পষ্ট করে বলি, ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলেন আর ‘লাল বদর’ বলেন, সত্য কিন্তু বলেই যাব। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ শাসকগোষ্ঠীর কারোর কাছ থেকেই আমার বিশেষ কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। শুধু চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই হোক একজন সাংবাদিকের কাজ। চাই—আমাদের সন্তানদের জন্য একটা উর্বর ভূমির নিশ্চয়তা।
লেখক: সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
