তারেক রহমানের এই মুহূর্তে দেশে ফেরা উচিত
প্রকাশ: ২০:২১, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
ফারদিন ফেরদৌস
ইংরেজিতে, ‘ডু অর ডাই’ এবং বাংলায় ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’ -বলে প্রবাদ-প্রবচন আছে। এর দ্বারা বোঝানো হয় এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে কোনো কাজ সম্পন্ন করতেই হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনে জীবনমান উৎসর্গ করতে হলেও প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর জীবন সংকটাপন্ন বলছেন চিকিৎসকরা। ঠিক এই সময় তাঁর বড় পুত্র এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করা তারেক রহমানের দেশে এসে মায়ের পাশে থাকা নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই সরকারের আমলে দেশে ফিরলে তারেক রহমানের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও কবি ব্রাত্য রাইসু তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ও সরকারের আমলে কী কারণে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান? ইমরান খানের মতো কইরা জেলে পচতে?’
খোদ তারেক রহমানও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।’
দেশটা যে ভয়াবহ এক পলিটিক্যাল ক্রাইসিস অতিক্রম করছে -তারেক রহমানের এই কথাগুলো থেকে তা অনুমান করা যায়। মা সিরিয়াসলি সংকটাপন্ন -এই মুহূর্তেও পুত্রকে মায়ের কাছে আসতে যদি, কিন্তু, তবে’র মতো দ্বিধাগ্রস্ততায় পড়তে হচ্ছে। অন্তরালে কী হচ্ছে জানি না, আমরা চর্মচক্ষে দেখলাম তারেক রহমানের নামে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়ে গেলো। তারপরও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি মন চাইলেও দেশে ফিরতে পারছেন না! কী হচ্ছে আসলে? কী হতে যাচ্ছে? এখন যদি দেশে না ফেরেন, সরকার বদল হলে আদৌ আর দেশে ফিরতে পারবেন? যদি না তাদের মনপছন্দ সরকার গঠিত হয়?
তারেক রহমান যদি এই মুহূর্তে দেশে না ফিরতে পারেন তবে বর্তমান সংকটময় রাজনীতিতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা তিনি কীভাবে প্রমাণ করবেন আমরা ঠিক জানি না। ঝুঁকিটা যদি নিরাপত্তাজনিত হয় তবে আমরা বলব প্রতিটি রাজনীতিবিদেরই এটা অমোঘ নিয়তি। ঝুঁকিতে নিজেকে না ফেললে গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করা যায় না। খালেদা জিয়ার সেই যে ‘দেশ ছেড়ে যাব না পণ’ -এটিই তাঁকে আপোসহীন নেত্রীর অভিধা দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রকৃতি বড় নির্মম। যে নেতা নিজেকে শক্তিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, এস্টাবলিশমেন্ট তথা রাষ্ট্রযন্ত্র তার দিকেই ঝুঁকে যায়। আর যিনি দুর্বলতার সংকেত দেন, তাকে মুহূর্তে পরিত্যাগ করে সকলেই -ব্যুরোক্রেসি, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আস্থাভাজনরাও। উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাই এমন; এখানে নীতির চেয়ে শক্তি, নৈতিকতার চেয়ে প্রদর্শিত সক্ষমতাই অধিক কার্যকর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, জিয়াউর রহমান শক্তি প্রদর্শন করেছিলেন ১৯৭৭-১৯৮১ পর্যন্ত। এরশাদ করেছিলেন ১৯৮২-১৯৯০। খালেদা জিয়া ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬। শেখ হাসিনা করেছিলেন ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত। তাদের প্রত্যেকেই যখন শক্তি দেখাতে পারেননি, পতন এসেছে মুহূর্তে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক শক্তির উৎস আসে জনসমর্থন থেকে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন নেতাকে টিকে থাকতে হয় দুই জায়গায় -বহির্বিশ্বের চাপ সামলে দেশের অভ্যন্তরে একটি দৃঢ় বলয় দাঁড় করানোর মাধ্যমে। সেই বলয় যতক্ষণ শক্তি ধরে রাখতে পারে, ততক্ষণ রাষ্ট্রযন্ত্র তার নিয়ন্ত্রণে থাকে। বলয় ভেঙে গেলে, পতন ঘটে তাসের ঘরের মতো দ্রুত। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ গত শাসনামল ও তার শীর্ষ নেত্রী -যাঁর চারপাশ একদিন অটুট বলে মনে হয়েছিল, অথচ একটি মুহূর্তে তিনি হয়ে গেলেন সম্পূর্ণ একা।
এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে -তারেক রহমান কি দেশে ফিরবেন? এবং ফিরলে তিনি কি নিজের ‘সক্ষমতার সংকেত’ দিতে পারবেন? কারণ এস্টাবলিশমেন্ট কোনো ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য দেখায় না; তারা আনুগত্য দেখায় ক্ষমতার প্রতি। যাকে শক্তিমান বলে মনে করে, যার নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে হয় -তারা তার পক্ষে দাঁড়ায়। হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরে প্রায় সবাই শেখ মুজিব ও হাসিনাবন্দনায় নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিল। এমনকি শেখ রাসেলকেও আবেগের আতিশয্যে আপনভাই ভাবত অনেকেই। অথচ ৫ আগস্টের পর সেই আবেগ, সেই আনুগত্য, সেই ভক্তিভাব -সব মুহূর্তে উবে গেছে। কারণ শক্তির বলয় ভেঙে পড়লে ভালোবাসা নয়, প্রথমে পালায় স্বার্থ।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও প্রেক্ষাপট একই। তিনি যদি দেশে এসে তার নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা, দলীয় সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কিংবা জনসমর্থনের সংকেত দেখাতে ব্যর্থ হন, তবে এস্টাবলিশমেন্টের বড় অংশ তাঁর দিকে এগোবে না। রাজনীতিতে শক্তি একটি বাস্তব অভিব্যক্তি -বক্তৃতায় নয়, মাঠে, সংগঠনে, সিদ্ধান্তে এবং ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতায় যেটা প্রকাশ পায়।
রাজনীতির নির্মম নিয়ম হলো: আপনি যতক্ষণ ভয় দেখাতে পারেন -অথবা অন্তত মানুষ আপনাকে ভয় পাওয়ার মতো নেতা মনে করে -ততক্ষণ আপনি নেতা। যখনই আপনার দুর্বলতা প্রকাশ পায়, তখন আপনাকে আর কেউ গোনে না। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার রাজনৈতিক নকশা এভাবেই কাজ করে -এখানে নৈতিকতা নয়, কার্যকারিতাই নেতৃত্বের মূল মাপকাঠি।
এমন বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে একটাই পথ -দেশে এসে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব সরাসরি নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। ইতিহাস বলে, রাজনীতিতে বিকল্প সবকিছু চলতে পারে, কিন্তু শক্তির প্রদর্শন ছাড়া কিছুই টেকে না। তাই আবারও বলি এস্টাবলিশমেন্ট হলো ক্ষমতার দাস। এস্টাবলিশমেন্ট যে রাজনীতিবিদের মধ্যে একচ্ছত্র পাওয়ার বা আধিপত্য দেখতে পায় নিজের সুবিধার জন্য টোটাল এস্টাবলিশমেন্ট ওই পলিটিশানের পায়ে লুটায়ে পড়ে।
জনসমর্থন, রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতিগত সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণ -তারেক রহমান দেশে না ফিরলে এর কোনোটাই বাজিয়ে দেখতে পারবেন না। আদর করে নিয়ে এসে মসনদেও তাঁকে কেউ বসিয়ে দেবে না। তাই তারেক রহমানের জন্য দেশে ফেরা এখনই “অবশ্য করণীয়” -শুধু শর্ত হলো, এটি যেন তার শক্তিকেই বাড়ায়, দুর্বলতাকে নয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৈবেদ্য’র পাঠ তারেক রহমানকে আত্মস্থ করতেই হবে:
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,
