ভয়াবহ বন্যায় নিহত বেড়ে ৬০০, নিখোঁজ বহু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:০১, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে টানা ভারী বর্ষণ, উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় এবং ভয়াবহ ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬০০–তে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ।
পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো। বিবিসি, রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে—ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় কয়েক কোটি মানুষ এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত।
বুধবার থেকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপজুড়ে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ শুরু হয়। আচেহ প্রদেশে বন্যার পানি এত দ্রুত বৃদ্ধি পায় যে পুরো গ্রাম কয়েক মিনিটের মধ্যে ডুবে যায়।
এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন,
“বন্যার সময় সবকিছু ভেসে গেছে। কাপড়চোপড় বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ঘরটাই ভেঙে গেল।”
ইন্দোনেশিয়ায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। আচেহ, বিরিউন, পশ্চিম সুমাত্রা—সব জায়গায় একই ছবি।
অনেকে ঘরের ছাদে আশ্রয় নিয়ে উদ্ধারকারীদের অপেক্ষা করছেন। খারাপ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, সুমাত্রায় বিরল উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় ‘সেনিয়ার’ ভয়াবহ ভূমিধসের সৃষ্টি করেছে। হাজারো ঘরবাড়ি, স্থাপনা, রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত; ১৫ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন।
এক নারী, আরিনি আমালিয়া বলেন—“স্রোত এতটাই দ্রুত ছিল যে কয়েক সেকেন্ডেই রাস্তাঘাট আর ঘরবাড়ি সব ডুবে গেল।”
থাইল্যান্ডে বন্যা–পরিস্থিতি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় সঙখলা প্রদেশে পানি তিন মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে। মাত্র এক দিনে হাতইয়াই শহরে ৩৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে—যা তিন শতাব্দীর মধ্যে রেকর্ড।
হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় মৃতদেহ রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে রাখা হচ্ছে। এক বাসিন্দা বলেন—“আমরা সাত দিন পানিতে আটকে ছিলাম; কোনো সংস্থা সাহায্য করতে আসেনি।”
সরকার নিহতদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ২ মিলিয়ন বাত (প্রায় ৬২ হাজার ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেরলিস অঙ্গরাজ্যেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে দুজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ।
ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়াহ–র আঘাতে শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখন পর্যন্ত ১৩০ জনের মৃত্যু এবং ১৭০ জনের বেশি নিখোঁজ।
দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
১৫ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, গৃহহীন প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ। অনেক এলাকায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ–পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই অস্বাভাবিক বন্যা ও বর্ষণের পেছনে রয়েছে একাধিক ঝড়ের পারস্পরিক প্রভাব—ফিলিপাইনের টাইফুন ‘কোতো’, মালাক্কা প্রণালিতে অস্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া ঝড় ‘সেনিয়ার’।
এই দুই সিস্টেম পরস্পরের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে মৌসুমি বৃষ্টিকে আরও তীব্র ও অনিয়মিত করেছে।
সাধারণত জুন–সেপ্টেম্বরের মধ্যে মৌসুমি বৃষ্টি হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষাকাল এখন প্রায়ই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে-কোথাও হঠাৎ প্রবল বর্ষণ, কোথাও আকস্মিক বন্যা, কোথাও ভয়াবহ ঝড়ো হাওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পরিস্থিতি এমনই থাকে, ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টি হবে আরও অনিশ্চিত, আরও বিপজ্জনক।
