পানিতে সেদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড
অন্যরকম ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭:১৬, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
পানিতে সেদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
ইতিহাসে নানা বর্বরোচিত কায়দায় মৃত্যুদণ্ড দেয়ার প্রমাণ মেলে। তবে মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে জীবন্ত মানুষকে গরম পানিতে সেদ্ধ করে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ছিলো সবচেয়ে নৃশংস ও পৈশাচিক।
ডেইলি মেইল জানায়, পনেরোশ বত্রিশ সালের এপ্রিল মাসে রিচার্ড রুজ নামে এক ব্যক্তিকে রাজা অষ্টম হেনরি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন।
প্রাচীন নথি অনুযায়ী, ১৫৩১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ লন্ডনের ল্যাম্বেথে রচেস্টারের বিশপ জন ফিশারের বাড়িতে খাবারে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছিলো তার বিরুদ্ধে। মামলার বাইরে তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, রুজ ওই বাড়িতে রাঁধুনির কাজ করতেন। কিংবা রাঁধুনীর বন্ধু ছিলেন।

বিশপ জন। ছবি: সংগৃহীত
ওইদিন সেখানে একটি জাকজমকপূর্ণ ডিনার পার্টি ছিলো। আর অতিথিদের খাবার রান্না করেছিলেন রুজ। ডিনারের পর ১৭জন লোক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ফিশারের পরিবারের সদস্য বার্নেট কারওয়েন এবং অ্যালিস ট্রিপিট নামে এক নারী ভিক্ষুক খাদ্যবিষক্রিয়ায় মারা যান। তদন্তে প্রমাণিত হয় রুজ খাবারে এক ধরণের অজ্ঞাত সাদা পাউডার মিশিয়েছিলেন। কিন্তু রুজ দাবি করেছিলেন, ওটা ছিলো তার একটা রসিকতা। কাউকে হত্যা করতে তিনি সেটি মেশাননি। তদন্তকারীদের তিনি বলেছিলেন, এক অপরিচিত ব্যক্তি তাকে ওই পাউডার দিয়েছিলেন।
খাদ্যের বিষক্রিয়া থেকে বেঁচে যান ফিশার। কারণ তিনি সেদিন উপবাস ছিলেন।
এই ঘটনায় রুজকে গ্রেফতার এবং তথ্য আদায় করতে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিলো।
রাজা হেনরি মামলাটি নিয়ে হাউজ অব লর্ডসে ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি রুজকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রুজই ব্রিটেনের প্রথম ব্যক্তি যাকে পানিতে সেদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো। যদিও মৃত্যুর বিবরণ খুব কম পাওয়া যায়। তবে সেই সময়ের নথিতে দেখা যায়, তাকে স্মিথফিল্ডে একটি গিবেটে, অর্থাৎ এক ধরনের লোহার খাঁচায় ভরে শেকল দিয়ে বেঁধে ফুটন্ত কড়াইয়ে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিলো। তিনি প্রচণ্ড জোরে গর্জন করছিলেন। দুই ঘণ্টা পর মৃত্যু হয় তার।
সেই আমলে আগুনে পুড়িয়ে, শুলে চড়িয়ে, এক কোপে গলা কেটে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের মাংস কেটে কেটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান ছিলো। কিন্তু ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড ছিলো সবচেয়ে ভয়ংকর ও যন্ত্রণাদায়ক।
পরবর্তী সময়ে রাজার রোষানলে পড়েন ফিশার। কারণ হেনরি তার প্রথম স্ত্রী আরাগনের ক্যাথরিনের সাথে বিয়ে বাতিল করে অ্যান বোলেনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফিশার চার্চের পক্ষে এই বিয়ে নিষিদ্ধ করে ক্যাথরিনের পক্ষ নেন। এবং বোলেনের উপর আক্রমণ করেন। তখন একটি গুজব রটেছিলো ল্যাম্বেথের বিষক্রিয়ার ঘটনায় ফিশার কিংবা তার পিতাকে দায়ী করা হতে পারে। এই ক্ষোভে তিনি রাজার বিরুদ্ধাচরণ করেন।
রাজার সাথে দ্বন্দ্বের জের হিসেবে ফিশারের জীবননাশের চেষ্টা করা হয়েছিলো। অ্যানের বাবা থোমাস আর্ল অব উইল্টশায়ারের বাড়ি থেকে ফিশারের বাসভবনের দিকে একটি কামান ছোঁড়া হয়েছিলো। যদিও কেউ তাতে আহত হননি, তবে ফিশারের বাড়ির ছাঁদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিলো।

পানিতে সেদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
এই আক্রমণ ও রুজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর রাজা হেনরি সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই ফিশারকে লন্ডন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ফিশার রাজার সেই আদেশ অমান্য করেন।
সর্বোচ্চ ক্ষমতার নির্দেশ না মানায় ১৫৩৫ সালে ফিশারকে মৃত্যুদণ্ড দেন রাজা হেনরি। ফলে রাজা ইংল্যান্ডের চার্চের প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং ক্যাথলিক চার্চের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বোলেনকে বিয়ে করেন।
রুজকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কিছুদিন পর এক ব্যক্তির উপপত্নীকে বিষ প্রয়োগ করায় একদাসীকে কিংস লিনে একই প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয়। ১৫৪২ সালে মার্গারেট ডেভি নামে এক দাসী তার মালিককে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করেন। স্মিথফিল্ডে তারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিলো। মৃত্যুদণ্ডের এই প্রক্রিয়াটি এতোই নির্মম ছিলো যে জনগণ তা পছন্দ করেননি। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের এই ভয়াবহতা দেখে অনেক নারীর গর্ভপাত হয়েছিলো। অনেকেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তাই এই আইনটি বেশিদিন টিকেনি। পরে রাজা হেনরির পুত্র ষষ্ঠ এডওয়ার্ড ১৫৪৭ সালে মানবতা বিরোধী আইনটি বাতিল করেন। কারণ রুজকে হত্যার পর জনগণ রাজার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলো।
বর্বর এই শাস্তিকে ইংল্যান্ডের নাগরিকরা তখন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ মৃত্যুদণ্ড বলে অভিহিত করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, এটা খারাপের চেয়েও খারাপ।
