৭৮ বছর পর প্রেমিকার দেখা
অন্যরকম ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:৩৪, ২২ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১০:৪৬, ২২ নভেম্বর ২০২৫
৭৮ বছর পর হুগুয়েট ও রেগ পাই। ছবি: পিএ
ইতিহাসে এ এক বিরল ভালোবাসা হিসেবেই রয়ে যাবে। এই ভালোবাসা লায়লি-মজনু, শিরি-ফরহাদ ও চণ্ডিদাস-রজোকিনির অমর প্রেমকেও হার মানায়। কারণ চন্ডিদাস প্রেমিকার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ১২ বছর শুকনো পুকুরে বড়শি বেয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া বৃটেনের এক সৈনিক ৭৮ বছর ধরে পথে-প্রান্তরে ভালোবাসার মানুষকে খুঁজেছিলেন। অবশেষে তাকে খুঁজেও পেয়েছিলেন।
দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ব্রিটিশ সৈন্য রেগ পাই। ফ্রান্সে সাউথ ওয়েলসের বারি পোর্টে সংঘটিত নরম্যান্ডির যুদ্ধে ২২৪ ফিল্ড কোম্পানির রয়েল ইঞ্জিনিয়ারদের চালক হিসেবে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ট্রাকে করে স্যাপার, মাইন এবং গোলাবারুদ বহন করতেন। তখন তার বয়স ছিলো ২১ বছর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেগ পাই। ছবি: পিএ
বিশ্বযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে ফ্রান্সে এক বালিকাকে তিনি ভালোবেসে ছিলেন। তার ভালোবাসার মানুষের নাম ছিলো হুগুয়েট ও তার বয়স ছিলো ১৪ বছর।
১৯৪৪ সালের জুনের এক সন্ধ্যায় রেগ পাই নাস্তা করছিলেন। তখন তিনি তার দরজার সামনে হুগুয়েটকে দেখতে পান। মেয়েটিকে তার খুব ভালো লাগে। প্রথম দেখাতেই তার মনে সৃষ্টি হয় এক গভীর ভালোবাসা। হুগুয়েটকে তিনি ডেকে পাশে বসান। তাকে পিলচার্ডের টিনে একটি জ্যাম স্যান্ডউইচ খেতে দেন। মেয়েটি তা খেয়ে চলে যায়।
পরদিন সকালে তিনি ঘুম থেকে উঠে দেখতে পান তার মেসের টিন দুধে ভরা। রাতেও টিনটি খালি ছিলো। টিনের পাশে একটি খাম দেখতে পান। সেই খামে ছিলো বালিকাটির একটি সাদাকালো ছবি ও একটি চিরকুট। ছবিটি তিনি তার মানিবাগে রেখে দেন। এরপর থেকে হুগুয়েটের কথা যখনই মনে পড়তো, তখন ছবিটি দেখতেন এবং পড়তেন সেই চিরকুট।

হুগুয়েট একটি চিরকুট এবং এই সাদাকালো ছবিটি রেখে যান। ছবি: পিএ
সেই দিনের পর থেকে রেগ পাই হুগুয়েটকে আর কোথাও খুঁজে পাননি। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর তিনি হুগুয়েটকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাননি। বৃদ্ধ বয়সেও রেগ পাই তার সেই ভালোবাসার মানুষকে ভুলতে পারেননি। মনে পড়লেই তাকে খুঁজে বেড়াতেন। না পেয়ে মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতেন।
ডেইলি মেইল জানায়, রেগ পাই হুগুয়েটকে ভুলতে না পারলেও বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী মেইরওয়েন ৭২ বছর বয়সে ২০১৫ সালে মারা যান। তার একমাত্র ছেলের সাহায্যেও তিনি হুগুয়েটকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সর্বশেষ ২০ বছর আগেও তিনি তাকে খুঁজতে নরম্যান্ডি গিয়েছিলেন। শেষে নিরাশ হয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি আশা ছাড়েন নি।
২০২২ সালের শুরুর দিকে রেগ পাই আবারো হুগুয়েটকে খুঁজতে ফ্রান্সে যান। তখন তিনি এক কৃষ্ণাঙ্গ ট্যাক্সি চালক পল কুককে তার জীবনের এই ট্রাজিডির কথা বলেন।
গল্পটি শোনার পর লন্ডনের কৃষ্ণাঙ্গ ট্যাক্সি ড্রাইভারদের দ্বারা পরিচালিত একটি সংগঠন ট্যাক্সি চ্যারিটি ফর মিলিটারি ভেটেরান্সের স্বেচ্ছাসেবক পল কুক হুগুয়েটকে খুঁজে বের করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা শুরু করেন।
প্রচারণা চলাকালে পল কুক, তার বন্ধু ইমা এবং ট্যাক্সি চ্যারিটির ফরাসি উপদেষ্টা নাথালি ভার্নিয়ারের সহযোগিতায় অবশেষে হুগুয়েটের সন্ধান মেলে।

হুগুয়েট ও রেগ পাই। ছবি: সংগৃহীত
শেষে একই বছরের নভেম্বর মাসে সাউথ ওয়েলসের বারি পোর্টে পাই ও হুগুয়েটের দেখা হয়। দেখা হওয়ার মুহূর্তটি তারা শ্যাম্পেন দিয়ে উদযাপন করেন। পাই তার মানিব্যাগে লুকিয়ে রাখা ছবিটি হুগুয়েটকে দেখান এবং আগের স্মৃতির স্মরণে তাকে আরেকটি জ্যাম স্যান্ডউইচ দেন। দেখা হওয়ার সময় রেগ পাইয়ের বয়স ছিলো ৯৯ এবং হুগুয়েটের ৯২ বছর।
এদিকে বিবিসি জানায়, দেখা হওয়ার পর রেগ পাই হুগুয়েটকে বলেন, আমি তোমাকে কখনো ভুলতে পারিনি। অনেক সময় পর আমাদের দেখা হলেও আমরা মনে-মননে একই রকম আছি। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা সেই প্রথম দিনের মতোই আছে। আমার বিশ্বাস ছিলো একদিন তোমার দেখা পাবোই। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি তোমার ছবি ৭৮ বছর ধরে বহন করে বেড়াচ্ছি! এই আশায় যে তোমাকে একদিন খুঁজে পাবোই।
তিনি বলেন, সবচেয়ে খারাপ সময়ে, এই মানবিক মিথস্ক্রিয়া আমার জীবনে এক বিশাল ছাপ ফেলেছে।
হুগুয়েট তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ৮ দশক ধরে তুমি আমার ছবি সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছো। এখন আমার উচিত তোমাকে বিয়ে করা। বাকি জীবনটা তাই তোমার সঙ্গেই কাটাতে চাই।
এই যুগলের মিলন করিয়ে দেয়ায় পল কুক বলেন, রেগ হুগুয়েটকে খুঁজে পেয়ে কতোটা আনন্দিত তা বর্ণনা করার কোনো ভাষা নেই। তাদের জীবন কাহিনি হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমার মতোই। তাদের ভালোবাসার কাহিনি নিয়ে একটি চমৎকার চলচ্চিত্র হতে পারে। এতে আমি অবাক হবো না।

হুগুয়েট ও রেগ পাই। ছবি: সংগৃহীত
সারাজীবন ভালোবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষা করা রেগ পাই ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান, তখন তার বয়স ছিলো ১০২ বছর।
তিনি মারা গেলেও তার গভীর ভালোবাসা দিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের মনে দাগ কেটে গেছেন। এই দুর্বিনীত ভালোবাসার কারণে কারমার্থেনশায়ারের বারি পোর্টের বাসিন্দা রেগ পাইকে মানুষ মনে রাখবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
