১৩ হাজার বছর পর জীবিত হলো ভয়ংকর নেকড়ে
অন্যরকম ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:৩৯, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
ডায়ার উলফ। ছবি: সংগৃহীত
প্রাগৈতিহাসিক যুগে এক প্রজাতির ভয়ংকর নেকড়ে বাঘ ছিলো। একে বলা হতো ডায়ার উলফ। তেরো হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে এই বাঘের বিলুপ্তি ঘটে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো এই বাঘ। বিজ্ঞানীরা এটি আবার জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছেন।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই ভয়ঙ্কর নেকড়েরা পৃথিবীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। জুরাসিক পার্কের সাথে তাদের বিলুপ্তির তুলনা করেছেন।

ডায়ার উলফ। ছবি: সংগৃহীত
ডেইলি মেইল জানায়, ১৩ হাজার বছর আগে আমেরিকা ছিলো বনভূমি, খোলা তৃণভূমি এবং রৌদ্রোজ্জ্বল সমভূমির লীলাভূমি। তখন সেখানে চড়ে বেড়াতো এই নেকড়ে।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, তারা ভয়ঙ্কর নেকড়ে বা অ্যানোসিওন ডায়ার (Aenocyon dirus) পুনরায় জীবিত করেছেন, যা HBO-র হিট সিরিজ গেম অব থ্রোনসে দেখানো বিলুপ্ত কুকুর।
আমেরিকার টেক্সাসের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি কলোসাল বায়োসায়েন্সের গবেষকরা নেকড়ের একটি জীবাশ্ম থেকে ডিএনএ ক্লোনিং এবং জিন-এডিটিং করে তিনটি ডায়ার উলফ শাবকের জন্ম দিয়েছেন। এদের নাম রোমুলাস, রেমাস এবং খালেসি। যুক্তরাষ্ট্রের ২০০০ একরেরও বেশি বিস্তৃত সংরক্ষণাগারে তারা বেড়ে উঠছে।

ডায়ার উলফের শাবক। ছবি: সংগৃহীত
সেখানে তাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রাণি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে তাদের পৃথিবীতে ছেড়ে দিলে বিপর্যয়কর পরিণতি হতে পারে।
ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ নিক রলেন্স কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের এই প্রচেষ্টাকে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীর ক্লাসিক জুরাসিক পার্কের সাথে তুলনা করে বলেছেন, যদি পর্যাপ্ত বন্য অঞ্চলে ছেড়ে দিয়ে এদের বংশবৃদ্ধি করা যায়, তবে এরা ধূসর নেকড়েদের চেয়েও বেশি শিকার করতে পারবে।

ডায়ার উলফের শাবক। ছবি: সংগৃহীত
মানুষ ও নেকড়েদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নেকড়েদের সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সাথে এই ধরণের সংঘাতও বাড়বে।
যখন এই নেকড়েগুলো শেষবার পৃথিবীতে বিচরণ করেছিলো, তখন এদের দৈর্ঘ্য ছিলো ছয় ফুট এবং ওজন ছিলো ৭০ কেজি, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সমান। ধূসর নেকড়ের চেয়ে এদের গড় ওজন ছিলো ২৫ শতাংশ বেশি।
ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিলিপ সেডন জোর দিয়ে বলেছেন যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত নেকড়েরা বেশি মাংসাশী। যদি তারা ঘুরে বেড়াতো, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণিদের তারা শিকার করে বেঁচে থাকতো। সৌভাগ্যবশত এদের ঘরবন্দি করে বড় করা হচ্ছে।
ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল ন্যাপ মনে করেন যে তারা ধূসর নেকড়েদের মতোই বিপজ্জনক, যেখান থেকে তারা জন্ম নেয়।

ধূসর নেকড়ে। ছবি: সংগৃহীত
ধূসর নেকড়ে এখনও ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে আছে। তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তারা প্রায়ই মানুষকে আক্রমণ করে। নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর নেচার রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী মানুষের উপর ২৬টি নেকড়ে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১২টিই হয়েছিলো তুরস্কে।
কলোসালের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা ক্রুজের বস্তুবিদ্যা ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক বেথ শাপিরো সিএনএনকে জানান, আমরা এমন কিছু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি না, যা অন্য প্রজাতির সাথে একশত ভাগ জিনগতভাবে অভিন্ন। আমাদের লক্ষ্য এই বিলুপ্ত প্রজাতিটির হুবহু অনুলিপি তৈরি করা। আমরা মনোনিবেশ করেছিলাম যে সত্যিকার অর্থেই যেন প্রজাপতিটি ফিরিয়ে আনতে পারি।

ডায়ার উলফের কঙ্কাল। ছবি: সংগৃহীত
তিনি আরও বলেন, ১৩ হাজার বছরের পুরোনো একটি দাঁত এবং ৭২ হাজার বছরের পুরোনো একটি খুলি থেকে ডিএনএর জেনেটিক বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে ধূসর নেকড়ের কোষগুলিকে পরিবর্তন করে ১৪টি জিনে আমরা ২০টি সম্পাদনা করি। নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে ফেলি। তারপর ধূসর নেকড়ের কোষ থেকে নিউক্লিয়াসটি সম্পাদনার পর ক্লোন করি।
প্রতিটি প্রচেষ্টায় গড়ে ৪৫টি ভ্রূণ তৈরি হয়েছে। সুস্থভাবে বিকশিত ভ্রূণগুলিকে গৃহপালিত কুকুরে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো। মিশ্র-প্রজাতির হাউন্ড যারা সারোগেট মা হিসেবে কাজ করেছে, বলেন তিনি।
কলোসালের মতে, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর দুটি পুরুষ ভয়ঙ্কর নেকড়ে ছানার জন্ম হয়েছিলো। একটি স্ত্রী ছানার জন্ম হয়েছিলো ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ সালে।
এদিকে টাইম ম্যাগাজিনকে বেথ শাপিরো জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে আমরা একটি বিবর্তনীয় শক্তি। বলতে বাধ্য হচ্ছি যে এই প্রজাতির ভবিষ্যৎ কী হবে? জৈবিক বৈচিত্র্য কেন্দ্র বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তিরিশ শতাংশ জিনগত বৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে। তাই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এইসব প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আমরা এমন একটি ভবিষ্যত চাই যা জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এবং মানুষে পরিপূর্ণ। শাপিরো বলেন, আমাদের নিজেদেরকে দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত যে আমাদের মস্তিষ্ক কী করতে পারে, যাতে আমরা ইতোমধ্যেই বিশ্বের সাথে যে খারাপ কাজ করেছি, তার বিপরীতে ভালো কিছু করা।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ভয়ঙ্কর নেকড়ে কী? ভয়ঙ্কর নেকড়ে অ্যানোসিয়ন ডায়ার (Aenocyon dirus) হলো একটি বিলুপ্ত নেকড়ে প্রজাতি যা ১৩ হাজার বছর আগে আমেরিকা মহাদেশে বিচরণ করতো। তারা ধূসর নেকড়েদের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বড় ছিলো। মাথা চওড়া, হালকা পুরু পশম এবং শক্তিশালী চোয়াল ছিলো। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিলো ঘোড়া এবং বাইসনের মাংস। বরফ যুগের শেষে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
অধ্যাপক মাইকেল ন্যাপ জানান, নেকড়েরা সাধারণত লাজুক এবং অধরা প্রাণি, যারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। কিন্তু যদি বন্য অঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের পরিবেশগত প্রভাব, অর্থাৎ তারা তাদের আশপাশের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বলা কঠিন।
যদি তাদের এমন একটি অঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখানে অন্যান্য নেকড়ে প্রজাতি বিরল হয়ে পড়েছে, তাহলে তারা বাস্তুতন্ত্রের উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, অধ্যাপক ন্যাপ বলেন।
তিনি আরও বলেন, যদি এই জিনগতভাবে ইঞ্জিনিয়ারড ধূসর নেকড়েগুলি অন্যান্য বন্য নেকড়েদের সাথে আন্তঃপ্রজনন করে, তাহলে অপ্রত্যাশিত পরিণতি হতে পারে।
এটি প্রথম জুরাসিক পার্ক সিনেমার ক্লাসিক, যেখানে ট্রাইসেরাটপস খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারণ তারা এমন উদ্ভিদ খাচ্ছিলো যা দশ লাখ বছর আগে বিবর্তিত হয়নি, বলেন তিনি।
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের মতে, ভয়ঙ্কর নেকড়েদের পেশীবহুল গঠন, শক্তিশালী চোয়াল এবং ধারালো দাঁত তাদেরকে ভয়ঙ্কর শিকারি করে তুলেছিলো।
র্যাঞ্চো লা ব্রিয়ার বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন, কেন তারা পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। তাদের ধারণা পরিবর্তনশীল জলবায়ু, অতিরিক্ত শিকার কিংবা খাদ্য সংকটে এই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
কলোসাল বায়োসায়েন্সেস ভয়ংকর নেকড়ে ফিরিয়ে আনাতেই থেমে নেই। ২ হাজার ৮০০ সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে তাসমানিয়ান বাঘ এবং ডোডোকেও তারা ফিরিয়ে আনতে চায়, যা ১৭ শতকে, অর্থাৎ সাড়ে ৩০০ বছর আগে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিলো।
এদের বিলুপ্ত হওয়ার কারণ, মানুষ তাদের বাসস্থানে বেঁচে থাকা অসম্ভব করে দিয়েছিলো, বলেন অধ্যাপক বেথ শাপিরো।
এটি সর্বকালের সবচেয়ে বিখ্যাত বিলুপ্তপ্রায় প্রাণিদের মধ্যে একটি যা মানুষ নির্মমভাবে শিকার করে এদের বিলুপ্তির পথে নিয়ে গেছে। এখন বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল প্রযুক্তি ও জিনোম ব্যবহার করে বিলুপ্ত প্রজাতিটিকে ফিরিয়ে আনছেন।
বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই হাড়ের নমুনা থেকে বিলুপ্ত প্রজাতির সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করার বিশাল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
খুব শিগগিরই ডোডোকে তার আদি নিবাস মরিশাসে ফিরিয়ে আনার কাছাকাছি পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা।
