এয়ারপোর্টের বেঞ্চকে বানিয়েছিলেন বেডরুম
অন্যরকম ডেস্ক
প্রকাশ: ১১:৫৪, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১২:০০, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
শারল দ্য গল বিমানবন্দরে ঘুমাচ্ছেন মেহরান কারিম নাসেরি। ছবি: এএফপি
ঘটনাটি বিস্ময়কর মনে হলেও পুরোপুরি সত্য। ঘরবাড়ি ছেড়ে এক ব্যক্তি ইউরোপের একটি ব্যস্ত এয়ারপোর্টে ১৮ বছর আটকে ছিলেন। এয়ারপোর্টের একটি লাল বেঞ্চকে তিনি বেডরুম বানিয়েছিলেন। গোসল করতেন এয়ারপোর্টেই। আর খাওয়া-দাওয়া করতেন ম্যাকডোনালসে। বিষয়টি অসম্ভবই বটে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করা এই লোকটির নাম মেহরান কারিম নাসেরি।

শারল দ্য গল বিমানবন্দরের ওয়াশরুমে শেভ করছেন মেহরান কারিম নাসেরি। ছবি: এএফপি
দ্য টেলিগ্রাফের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি তার জীবনের ১৮ বছর কাটিয়েছেন একটি এয়ারপোর্টে। এটা ছিলো ইউরোপের ব্যস্ত এক এয়ারপোর্ট। সারাদিন মানুষের হট্টগোল। প্লেন ওঠা-নামা কিংবা মাইকের শব্দে কান ভারী হয়ে আসা পরিবেশ। বসারও তেমন জায়গা পাওয়া যায় না বললেই চলে। সেখানে এক ছোট্ট লাল রঙের বেঞ্চকেই ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। এক দুই দিন নয়, টানা ১৮ বছর।

বিশ্ব বিখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র ‘দ্য টার্মিনাল’-এর পোস্টার দেখছেন মেহরান কারিম নাসেরি। স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত এবং টম হ্যাঙ্কস অভিনীত এই জনপ্রিয় সিনেমাটি মেহরান কারিম নাসেরির বাস্তব জীবনকাহিনী অবলম্বনে তৈরি। ছবি: এএফপি
অন্যদের কাছে মেহরান কারিম নাসেরির নামটা উচ্চারণ করা কঠিন হওয়ায় তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন আলফ্রেড। সেই এয়ারপোর্টে তিনি এতোটাই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন যে তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে বই 'দ্য টার্মিনাল ম্যান'। এবং তৈরি হয়েছে সিনেমা দ্য টার্মিনাল। তিনি সেখানে ইচ্ছে করে ছিলেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে সেখানে তিনি থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।

হলিউড তারকা টম হ্যাঙ্কস, দ্য টার্মিনালে মেহরান কারিম নাসেরির চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবি: সংগৃহীত
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কেন সেখানে ছিলেন তিনি? কিভাবে থাকতেন? কি খেতেন সেখানে? টাকাই বা পেতেন কোথায়? ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৮৮ সালে। নাসেরির বাড়ি ইরানে। ১৯৪৫ সালে তার জন্ম। ঘটনাটি ঘটার বছর আগস্ট মাসের ৪ তারিখে নাসিরী এসে পৌঁছান প্যারিসের শারল দ্য গল বিমানবন্দরে। গন্তব্য ছিলো যুক্তরাজ্য। কিন্তু তার কাছে বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় তাকে বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি। ফলাফল, তিনি বিমানবন্দরেই রয়ে গেলেন প্রথম রাতে। এভাবে এক সপ্তাহ, তারপর এভাবেই মাস কেটে গেল।
সেই সময় কেউ কল্পনাও করেনি, এই অস্থায়ী অপেক্ষা এতোদিন দীর্ঘ হবে। তিনি ঠিক করেছিলেন, সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরেই থাকবেন। কারণ বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ফ্রান্সে থাকার অনুমতি ছিলো না তার। কয়েকবার তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিলো। জেলেও থাকতে হয়েছে তাকে। যেহেতু সেখানকার বিমানবন্দরে কাগজপত্রের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয় না, তাই তিনি সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

স্থানীয় পুলিশ ষ্টেশন থেকে দেওয়া মেহরান কারিম নাসেরির নথি। এখানে হাতে লেখা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। উপরের ডানদিকে তারিখটি হলো, ১৯৮৮ সালের ১৬ নভেম্বর। এতে তার নাম, জন্ম সাল ও জন্মস্থান উল্লেখ আছে। ছবি: এএফপি
নাসেরি থাকতেন টার্মিনাল-১ এর ডিপার্চার লাউঞ্জে। সেখানে একটা বেঞ্চ ছিলো তার বিছানা। প্রতিদিন সকালে তিনি ঘুম থেকে উঠতেন এয়ারপোর্টে মাইকের ঘোষণা শুনে। ওয়াশরুমে যেতেন অন্য কেউ যাওয়ার আগেই। সকাল, দুপুর ও বিকেলের খাবার খেতেন ম্যাকডোনাল্ডসে। খাবার যোগাড় করতেন বিমানবন্দরের সহানুভূতিশীল কর্মীদের মিল ভাউচারে।
সারাদিন সময় কাটাতেন ডায়রি লিখে, বই পড়ে এবং মানুষের সাথে গল্প করে। সেখানকার মানুষদের কাছেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। নাসেরি এয়ারপোর্টে ছিলেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এরপর তার ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। এরপর তাকে আর এয়ারপোর্টে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি ঠিকই ফিরে এসেছিলেন ২০২২ সালে। এর কয়েক সপ্তাহ পর ১২ নভেম্বর তিনি এয়ারপোর্টেই মারা যান।

শারল দ্য গল বিমানবন্দরে বিমান উঠা নামা দেখছেন মেহরান কারিম নাসেরি। ছবি: এএফপি
তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো হতাশায় ডুবে যেতেন। তবে নাসেরী ছিলেন আশাবাদী। তিনি চেষ্টা করতেন সেখানে প্রতিটা দিন ভালোভাবে কাটাতে। আশায় ছিলেন কোনো একদিন সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। তিনি ফিরতে পারবেন স্বাভাবিক সুন্দর জীবনে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি।
