দ্য ডিপ্লোম্যাট
কেন ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না
সমাজকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭:১৮, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি
জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠতে ভারতকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু রায় ঘোষণার ১০ দিনেও সেই চিঠির কোন উত্তর দেয়নি দেশটি এবং এ নিয়ে কোন কথাও বলেনি।
এমন অবস্থায় গত ২৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত পাঠাবে না ও কেন পাঠাবে না সে তথ্যেরও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সুধা রামচন্দ্রনের লেখা ‘কেন ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-
“বাংলাদেশ ভারতের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য একটি নোট ভার্বাল পাঠিয়েছে। গত বছর জুলাই-আগস্টের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পাঁচ দিন পর এই আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়। সে দমন-পীড়নে আনুমানিক ১,৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন।
ঢাকার এই অনুরোধ মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।
নভেম্বর ১৭–এর রায় ঘোষণার পরই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কড়া ভাষায় ভারতের প্রতি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়- “আমরা ভারত সরকারকে অনতিবিলম্বে দুই দণ্ডিতকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানাই।”
তাদের দাবি, দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের “বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।” কোনো দেশ এসব মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলে তা অত্যন্ত “অমিত্রসুলভ আচরণ” এবং “ন্যায়বিচারের প্রতি অবমাননা” হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি বিবৃতি দিচ্ছেন ও গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন— যা বাংলাদেশ সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বহুবার তার প্রত্যর্পণের দাবি তুলেছে। কিন্তু ভারত তার কোনো অনুরোধেই সাড়া দেয়নি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার পাঠানো প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুরোধের জবাবে দিল্লি শুধু “গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত” করেছিল। দ্বিতীয় অনুরোধেরও এখনো কোনো জবাব দেয়নি।
রায়ের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল বলেছিল, তারা “রায়টি নোট করেছে।”
আরও বলেছে- “বাংলাদেশের জনগণের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে লক্ষ্যে আমরা সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে যাব।”
কিন্তু তারা প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে একটিও শব্দ ব্যয় করেনি।
দিল্লি আপাতত বিষয়টি সামনে এগিয়ে নেবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট আইডিএসএ–র গবেষক স্মৃতি এস. পট্টনায়ক মন্তব্য করেছেন, “বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ‘সীমিত ক্ষমতা ও কর্মপরিধির একটি ট্রানজিশনাল সরকার’— তাই দিল্লি নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
অনেক বাংলাদেশির কাছে— বিশেষ করে যাদের পরিবার হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বা ছাত্র আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে— এই রায় একটি ন্যায়বিচারের প্রতীক। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অসম্ভব, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ভারতে আছেন। তাই তার প্রত্যর্পণ তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা
যদিও ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি বাংলাদেশের দাবিকে আইনি ভিত্তি দেয়, দিল্লির ভেতরে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রায় কোনো সমর্থন নেই— বরং মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিরোধিতা আরও বেড়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো সর্বত্রই তার প্রত্যর্পণের বিরোধিতা করছে।
কারণ ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের—বিশেষ করে শেখ হাসিনার পরিবারের—দশকের পর দশকজুড়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৭১ সালে ভারতের সমর্থন, ১৯৭৫ সালে পরিবার হত্যাকাণ্ডের পর হাসিনা ও তার বোনকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় হাসিনার ভূমিকা- এসব দিল্লিকে তার প্রতি অনুকূল মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
বিশেষত, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জঙ্গি সংগঠন এবং পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান দিল্লির কাছে তাকে “বিশ্বস্ত অংশীদার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
ভারতের কূটনীতিকদের মতে, এ রকম একজন “ঘনিষ্ঠ মিত্রকে” মৃত্যুদণ্ডের মুখে ঠেলে দেওয়া দিল্লির কৌশলগত সম্পর্কগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে— অন্যান্য মিত্রদের কাছেও ভুল বার্তা যাবে যে ভারত অবিশ্বাসযোগ্য।
ভারত কীভাবে আইনি পথেও অস্বীকৃতি জানাতে পারবে
২০১৩ সালের চুক্তিতে একটি সুযোগ রয়ে গেছে— যদি অপরাধ “রাজনৈতিক চরিত্রের” হয়, তবে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যাবে।
চুক্তিতে বলা আছে, হত্যা বা খুনকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা হলেও, শেখ হাসিনার এসব অপরাধে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা বাংলাদেশের জন্য প্রায় অসম্ভব হবে।
ভারত আরও যুক্তি দিতে পারে যে, শেখ হাসিনার বিচার সুষ্ঠু হয়নি, আইসিটি আদালত অবৈধ ও অসাংবিধানিক, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
যদি ভারত সম্মত হয় তবুও দীর্ঘ পথ
প্রত্যর্পণে সম্মতি দিলেও পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ হবে।
ভারতে পূর্ণাঙ্গ আদালত প্রক্রিয়া চলবে, যেখানে হাসিনা নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দিতে পারবেন—যা তিনি বাংলাদেশে করতে পারেননি।
বাংলাদেশে ভারতের অবস্থান আরও কঠিন হবে
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে কোনো ঝুঁকি নিতে ভারত চাইবে না। দিল্লি “শান্ত, ধীর এবং নীরব কূটনীতি” বজায় রেখে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের—সামরিক বাহিনীসহ—সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে চাইবে।
নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় ভারত বিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করতে পারে—ভারত যে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং প্রত্যর্পণে অনীহা দেখাচ্ছে, তা সহজেই রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি পরবর্তী এক বছরে যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, তা আগামী মাসগুলোতে আরও খারাপ হতে পারে।
