মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘ডাবল-স্ট্রাইক’ বিতর্ক
সমাজকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:০২, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী একটি নৌকায় প্রথম দফার হামলায় সবাই নিহত হয়নি বুঝতে পেরে দ্বিতীয় দফায় আবারও আঘাত হেনে বেঁচে থাকা সবাইকে হত্যা করেছে । এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। সিএনএন-কে দেওয়া এসব তথ্যে বলা হয়েছে, ২ সেপ্টেম্বরের সেই হামলায় মোট ১১ জন নিহত হয়, যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুরু করা ধারাবাহিক মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের প্রথম অংশ।
ঘটনাটিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা ‘ডাবল-ট্যাপ স্ট্রাইক’ বলে উল্লেখ করছেন—যা যুদ্ধবিধি লঙ্ঘনের শামিল কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

প্রথম হামলায় নৌকা অচল, দ্বিতীয় হামলায় নিহত সবাই
সূত্র জানায়, প্রথম আঘাতের পর নৌকাটি ধ্বংস হলেও কিছু লোক জীবিত ছিল। পরে মার্কিন বাহিনী নৌকাটি ডুবিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি জীবিত থাকা সদস্যদের হত্যা করতে দ্বিতীয়বার আঘাত হানে।
রক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অভিযানের আগে বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: “সবাইকে টার্গেট নিশ্চিত করতে হবে।” তবে তিনি দ্বিতীয় হামলার আগে জীবিতদের বিষয়ে অবগত ছিলেন কি না—তা পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন হামলার দিনই ঘটনা ঘোষণা করেছিল, তবে বেঁচে থাকা মানুষদের হত্যা করা হয়েছে—এ তথ্য তারা কখনোই স্বীকার করেনি।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ভেনেজুয়েলায় ‘স্থল অভিযান খুব শীঘ্রই’
হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল এ দাবি করেন—নৌকায় থাকা সবাই “ট্রেন দে আরাগুয়া” কার্টেলের ‘নার্কো-টেররিস্ট’।
গত বৃহস্পতিবার তিনি আরও ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় সন্দেহভাজন মাদক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান “শুরু হতে পারে খুব শীঘ্রই”—যা নিয়ে আইনি বিতর্ক আরও বেড়েছে।
ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য ম্যাডেলিন ডিন সিএনএন-কে বলেন,“এই প্রশাসন কোনো পরামর্শ ছাড়াই একের পর এক নৌকা ধ্বংস করছে। একটি এসসিআই–এ গিয়ে আমি নথি দেখেছি—সেখানে কোথাও এসব ‘হত্যাকাণ্ডের’ যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে—যদি নৌকার আরোহীরা অযুদ্ধযোদ্ধা (সিভিলিয়ান) হন, তবে এটি সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যা।
আর যদি তারা কমব্যাট্যান্ট হিসেবে বিবেচিতও হয়, তবুও যুদ্ধে অক্ষম (‘হরস ডি কমফেট) ব্যক্তিকে হত্যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অপরাধ।
পেন্টাগনের সাবেক আইন উপদেষ্টা সারাহ হ্যারিসনের ভাষায়— “যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক—এটি বেআইনি। প্রথমত, তারা বেসামরিক। দ্বিতীয়ত, কমব্যাট্যান্ট ধরলেও আহত বা আত্মসমর্পণের পর তাদের হত্যা করা যায় না—এটি যুদ্ধবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।”
সিএনএন জানিয়েছে, হামলাগুলোকে বেআইনি মনে করে যুক্তরাজ্য ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন নৌকার বিষয়ক গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগাভাগি বন্ধ করে দিয়েছে—কারণ এতে তারা মার্কিন হামলায় ‘সহযোগী’ হয়ে যেতে চায় না।
মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল অ্যালভিন হোলসি এই হামলার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে রক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি তার পদত্যাগের প্রস্তাব দেন এবং ডিসেম্বরে দায়িত্ব ছাড়ছেন, মাত্র এক বছর দায়িত্বে থাকার পর।
হামলার আগে মার্কিন বিচার বিভাগ একটি গোপন আইনি মতামত দেয়, যেখানে বলা হয়—
২৪টি মাদক কার্টেল আমেরিকার জন্য “তাৎক্ষণিক হুমকি”—তাই প্রেসিডেন্ট তাদের বিরুদ্ধে লেথাল ফোর্স ব্যবহার করতে পারেন।
কিন্তু সিএনএন–এর তদন্তে উঠে এসেছে—কিছু নৌকা হামলার আগ মুহূর্তে মার্কিন জলসীমা থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। ২ সেপ্টেম্বরের হামলার বেঁচে থাকা লোকজন ছিল সম্পূর্ণভাবে অক্ষম অর্থাৎ ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’র দাবি টেকসই নয়।
সেপ্টেম্বরের আগে মাদকবাহী নৌকা আটকানোর কাজ করত কোস্টগার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সন্দেহভাজনদের আটক করে আদালতের মুখোমুখি করা হতো।
এখন—
সরাসরি সামরিক হামলায় হত্যা করা হচ্ছে, প্রায়শই পরিচয় নিশ্চিত না করেই।
কেন জীবিতদের উদ্ধার করা হয়নি?
অক্টোবরের আরেক ঘটনায় মার্কিন বাহিনী দুইজনকে উদ্ধার করে নিজ দেশে পাঠিয়েছে।
কিন্তু ২ সেপ্টেম্বরের হামলায় বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হয়নি কেন—এর উত্তর মেলেনি।
