অরুণাচলের নারীকে আটকে ভারত–চীন সম্পর্কে ফাটল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯:০৫, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা এক ভারতীয় নারীকে চীনের সাংহাই পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে ভারত–চীন সম্পর্কে। সীমান্ত বিরোধে বরাবরই সংবেদনশীল এই ইস্যু আবারও দুই দেশের সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নাড়া দিয়েছে।
কী ঘটেছিল সাংহাই বিমানবন্দরে?
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা প্রেমা ওয়াংজম থংডক যুক্তরাজ্য থেকে জাপানে যাওয়ার পথে সাংহাইয়ে ট্রানজিটে ছিলেন। সেখানে তার পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে “অরুণাচল প্রদেশ” লেখা থাকায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে প্রায় ১৮ ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
চীনা কর্মকর্তারা নাকি জানান—অরুণাচল তাদের “জাংনান” অঞ্চল, তাই ভারতীয় পাসপোর্টের ভিত্তিতে তার পরিচয় “অবৈধ”। পরে তাকে চীনা ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের নতুন টিকিট কিনতে চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন থংডক। এতে তার আর্থিক ক্ষতিও হয়।
যুক্তরাজ্যে থাকা এক বন্ধুর সহায়তা এবং সাংহাইয়ে ভারতীয় কনসুলেটের হস্তক্ষেপে তিনি সেদিন রাতেই শহর ছাড়তে সক্ষম হন।
এর আগে এমন ঘটনা কি ঘটেছে?
২০০৫ সাল থেকে চীন অরুণাচলবাসীদের ‘স্ট্যাপলড ভিসা’ দেওয়া শুরু করে—যা সাধারণ পাসপোর্টে লাগানো হয় না বরং আলাদা কাগজে দেওয়া হয়। কারণ চীনের দাবি—অরুণাচলের মানুষ নাকি “চীনা নাগরিক”।
ভারত তা কখনোই স্বীকার করেনি। ফলে বিভিন্ন সময় ক্রীড়াবিদরা চীনে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারার ঘটনা ঘটেছে।
বিরোধের মূল শেকড় কোথায়?
এই বিতর্কের সূচনা উপনিবেশিক আমলে।১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনে ভারত, তিব্বত ও চীনের মধ্যে যে ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করা হয়—চীন তা স্বীকার করেনি। ভারত স্বাধীনতার পর থেকেই এই লাইনকে বৈধ সীমান্ত হিসেবে মানছে। কিন্তু বেইজিং পুরো অরুণাচলকেই নিজেদের অংশ দাবি করে আসছে।
ইতিহাসে সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া
অরুণাচলকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়।১৯৬২ সালের যুদ্ধের একটি বড় ফ্রন্ট ছিল এই অঞ্চলে।১৯৭৫ সালে তুলুং লায় সংঘর্ষে চার ভারতীয় সেনা নিহত হন।২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভয়াবহ সংঘর্ষে দুই দেশের সেনারা হতাহত হয়।দালাই লামার সফর, সীমান্তে হাতাহাতি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—এসব বিষয়েও উত্তেজনা দেখা গেছে বহুবার।
অরুণাচল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের জন্য অঞ্চলটি সামরিক, কূটনৈতিক এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগে এটি প্রধান ভূমিকা রাখে।ভুটান ও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে হওয়ায় নিরাপত্তার দিক থেকেও সংবেদনশীল।চীনের কাছে তাওয়াং ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ এখানেই জন্ম হয় ষষ্ঠ দালাই লামার।
দুই দেশের প্রতিক্রিয়া কী?
চীন সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—জাংনান তাদের ভূখণ্ড, তাই তারা “আইন অনুযায়ী” ওই নারীর সঙ্গে আচরণ করেছে।
ভারত তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে,.অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।চীনের দাবি বাস্তব বদলাতে পারে না।আন্তর্জাতিক ট্রানজিট নিয়ম ভঙ্গ করেছে বেইজিং।
সম্পর্ক কি আবার খারাপের দিকে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা তৈরি করলেও বড় ধরনের কূটনৈতিক ক্ষতি হবে না।
গালওয়ানের পর দীর্ঘদিন উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও গত এক বছরে কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার—সম্পর্ক কিছুটা উন্নতির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
তবে পারস্পরিক সন্দেহ, সীমান্ত বিরোধ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো বিদ্যমান—এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলেই ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
