ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজায় নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে: জার্মান গবেষণা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:৩৩, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান ইসরায়েলি হামলায় এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে জার্মানির বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চ–এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে।
জার্মান সাপ্তাহিক পত্রিকা জাইট এই গবেষণা প্রকাশ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে— সরকারি হিসাবের তুলনায় বাস্তবে নিহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এতদিন পর্যন্ত মৃত্যুর একমাত্র সরকারি উৎস ছিল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যারা যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে ৬৭ হাজার ১৭৩ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। কিন্তু নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, একই সময়ে ৯৯ হাজার ৯৯৭ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৫ জন মানুষ নিহত হয়েছেন।
গড় হিসাব ধরলে মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ১২ হাজার ৬৯ জন।
গবেষণা দলের কো–লিডার ইরিনা চেন বলেন,
“সঠিক মৃতের সংখ্যা আমরা কখনোই জানতে পারব না। তবে যতটা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি একটি চিত্র তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।”
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের গবেষকরা বলেন—গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুধুমাত্র নিশ্চিত মৃত্যু, অর্থাৎ হাসপাতাল থেকে ইস্যুকৃত সনদভিত্তিক তথ্য গণনা করে।
কিন্তু যুদ্ধের কারণে অনেক হাসপাতাল ধ্বংস বা অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় হাজারো লাশ ভর্তি হয়েছে ধ্বংসস্তূপে, যা সরকারি রেকর্ডে ধরা পড়ে না।
পরিবারভিত্তিক স্বাধীন সমীক্ষা, সোশ্যাল মিডিয়ার মৃত্যুসংবাদ ও অন্যান্য উৎস মিলিয়ে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি।
এ কারণে অন্যান্য গবেষণা আগেই দেখিয়েছে— স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব সাধারণত রক্ষণশীল, বাস্তব মৃত্যুহার তার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।
গবেষণায় যে বিশ্লেষণ পাওয়া গেছে-
মৃতদের ২৭%— অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশের বেশি— ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু
২৪% নারী, যাদের মৃত্যুর তথ্য প্রায়ই অফিসিয়াল রেকর্ডে কম নথিবদ্ধ হয়
৬০ বছরের বেশি মানুষের মৃত্যু বহু ক্ষেত্রে হিসাবের বাইরে থেকে গেছে
গবেষণা দল পুরুষ–নারী এবং বয়সভিত্তিক আলাদা মৃত্যুহার বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে এই যুদ্ধ সাধারণ নাগরিককেই সবচেয়ে বেশি হত্যা করেছে।
গড় আয়ু কমে এসেছে ভয়াবহভাবে
গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগে গড় আয়ু ছিল—
নারী: ৭৭ বছর
পুরুষ: ৭৪ বছর
কিন্তু ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—
নারীর আনুমানিক আয়ু নেমে এসেছে ৪৬ বছরে
পুরুষের ৩৬ বছরে
গবেষকদের মতে—যদি সহিংসতা একই মাত্রায় চলতে থাকে, তাহলে গাজার মানুষ এই বয়স পর্যন্তই বাঁচতে পারবে— এমন ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি বিমানহামলায় বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচে হাজারো মানুষ চাপা পড়ে মারা গেছেন বলে গবেষকরা মনে করেন। ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো প্রযুক্তি, শ্রমশক্তি বা নিরাপদ পরিবেশ গাজায় নেই; ফলে অগণিত মৃত্যু আজও অচিহ্নিত।
গাজায় জীবনযাত্রা: মানবিক বিপর্যয়ের সর্বোচ্চ উদাহরণ প্রতিদিন গড়ে ৫০–৬০টি পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। হাজারো শিশু অনাথ ও স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকট চরম পর্যায়ে।
পানি, বিদ্যুৎ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে একেবারে।
গবেষণার তথ্য — এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনা।”
