ডেনমার্কের কঠোর অভিবাসন নীতি ইউরোপে মডেল হয়ে উঠছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:৫৫, ২০ নভেম্বর ২০২৫
ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম ডেনমার্ক। দেশটির কঠোর ও কৌশলগত অভিবাসন নীতিকে “কার্যকর” হিসেবে তুলে ধরছে ইউরোপের বহু মূলধারার রাজনৈতিক দল। এমনকি ব্রিটেনের নবনির্বাচিত লেবার সরকারও এই মডেলকে নীতিগত রূপান্তরের উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন—যিনি কেন্দ্র-বাম সরকার পরিচালনা করেও কঠোর অভিবাসন আইন ধরে রেখেছেন—ইউরোপে ধারাবাহিকভাবে তিন দফা নির্বাচনে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই সাফল্যের কেন্দ্রেই রয়েছে দেশটির কঠোর আশ্রয় নীতি, যা এখন ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেন ডেনমার্ক ‘মডেল দেশ’?
২০১৫ সালে সিরিয়া ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইউরোপে এক বছরে ১৩ লাখ আশ্রয় প্রার্থীর ঢল নামে। জার্মানির আঙ্গেলা মেরকেল তখন “উইর শাফেন দাস”—“আমরা পারব”—বলে শরণার্থীদের স্বাগত জানান। কিন্তু ডেনমার্ক নেয় ভিন্ন পথ।
যেসব কারণে ডেনমার্ক আলাদা—
অস্থায়ী স্ট্যাটাস: আগে ৫ বছর পর আশ্রয়প্রার্থীরা স্থায়ী স্ট্যাটাস পেতেন। এখন স্ট্যাটাস থাকে মাত্র ১–২ বছরের জন্য।
স্থায়ী নাগরিকত্বের অপেক্ষা ৮ বছর: এবং শর্ত—ডেনিশ ভাষায় দক্ষতা, দীর্ঘদিনের পূর্ণকালীন চাকরি, সরকারি ভাতা না নেওয়া ইত্যাদি।
পারিবারিক পুনর্মিলন কঠোর: স্বামী–স্ত্রী উভয়েরই বয়স ২৪ বছরের বেশি হতে হবে, ভাষা পরীক্ষা পাস করতে হবে, এবং ৩ বছর সরকারি ভাতা গ্রহণ না করার প্রমাণ দিতে হবে।
‘গেট্টো’ বা ‘সমান্তরাল সমাজ’ নীতি: ৫০% এর বেশি ‘নন-ওয়েস্টার্ন’ বাসিন্দা থাকা হাউজিং ব্লক ভেঙে দেওয়া বা বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে।
‘জুয়েলারি ল’ বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত নীতি: ১০,০০০ ক্রোন (প্রায় ১,৫০০ ডলার) এর বেশি মূল্যবান সম্পদ আশ্রয় ব্যয়ের জন্য বাজেয়াপ্ত করার নিয়ম।
সমালোচনার মুখে থাকলেও এসব নীতির ফলে আশ্রয় আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৪ সালে যেখানে ৬,০৩১ জন আশ্রয় পান, ২০১৯ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১,৭৩৭ জনে। ২০২৪ সালে ডেনমার্কে প্রতি ১০,০০০ জনে আশ্রয় দাবি মাত্র ৪ জন, যেখানে ব্রিটেনে ১৬ জন।
ব্রিটেন কেন ডেনমার্ককে অনুসরণ করছে?
ব্রিটেনের লেবার সরকার শাসনভার নেওয়ার পরই চাপে পড়ে রিফর্ম ইউকে –এর মতো জনতাবাদী দলের চাপের মুখে। দেশে অবৈধ অভিবাসী সংকট, চ্যানেল ক্রসিং এবং হোটেলে আশ্রয়প্রার্থী রাখার ব্যয়—সব মিলিয়ে ব্রিটিশদের আস্থা টলমল।
লেবারের ঘোষণা করা নতুন নীতি—
স্থায়ী স্ট্যাটাস পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর।
প্রতি ২.৫ বছর পর পর স্ট্যাটাস রিভিউ; মূলদেশ নিরাপদ হয়েছে মনে হলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
ডেনমার্কের মতো আশ্রয় ব্যয় মেটাতে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নিয়ম চালুর ইঙ্গিত।
কঠোর এই অবস্থানকে ব্রিটেন ডেনমার্কের ‘কার্যকর নীতি’ হিসেবে সামনে এনেছে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা সরাসরি ডেনমার্কে গিয়ে পুরো সিস্টেম পর্যবেক্ষণও করে এসেছেন।
সমালোচনার মুখে ‘ড্যানিশ মডেল’
ডেনমার্কে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অতিরিক্ত কঠোরতা উল্টো ইন্টিগ্রেশন ব্যর্থতার কারণ হচ্ছে।
মাইকেলা ক্লান্তে বেন্ডিকসেন, ‘রিফিউজি ওয়েলকাম ডেনমার্ক’-এর প্রধান, সিএনএনকে বলেছেন:“মানুষ যখন দেখে ভবিষ্যৎ নেই, তখন তারা ভাষা শেখা বা কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করার আগ্রহ হারায়। এটা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে।”
ব্রিটেনেও একই শঙ্কা:
লেবার এমপি স্টেলা ক্রিসি বলেছেন—
“এটা performative cruelty; এতে না হবে সংহতি, না হবে সামাজিক স্থিতি।”
ইতিহাসের সাক্ষী আলফ ডাবস—যিনি ১৯৩৯ সালে নাৎসি নিপীড়ন থেকে Kindertransport-এ করে ব্রিটেনে এসেছিলেন—নতুন নীতিকে বলছেন “shabby and depressing”।
ইউরোপের সামনে প্রশ্ন—কঠোরতা কি সমাধান, নাকি নতুন সংকটের সূচনা?
ডেনমার্ক নিঃসন্দেহে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে পেরেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এমন নীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে “দ্বিপাক্ষিক বিচ্ছিন্নতা” তৈরি করে, যা তরুণদের অপরাধ, গ্যাং সংস্কৃতি এবং ‘সমান্তরাল সমাজ’ তৈরিতে ঠেলে দিতে পারে।
ব্রিটেন সেই পথেই হাঁটতে চাইছে। কিন্তু ইউরোপের বহু বিশ্লেষক মনে করছেন—এই মডেল কঠোর হলেও টেকসই নাও হতে পারে। সূত্র : সিএনএন
