এভাবেই নারী কৃষক প্রান্তিক থেকে যায়
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশ: ২৩:১৫, ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ২৩:৫৩, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলার উৎসবে ‘নবান্ন’ শিরোনামে আঁকা ছবি। ছবি: তাসকিনা ইয়াসমিন
অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ শুরু হয়েছে। এখন আমরা উপভোগ করছি হেমন্ত ঋতুর রূপ, সৌন্দর্য। গত রবিবার (১৬ নভেম্বর) ছিল ১ অগ্রহায়ণ। দিনটি ঘিরে সারা দেশেই ‘নবান্ন উৎসব’ পালিত হয়।
মানিকগঞ্জের ঘিওরে সাংবাদিক ও কৃষিবিদ দেলোয়ার জাহানের নেতৃত্বে স্থানীয় কৃষক এবং সারা দেশ থেকে অংশ নেওয়া কৃষিপ্রেমীরা নবান্ন উৎসব উদযাপন করেন। ঢাকা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা আয়োজনে নবান্ন উৎসব হয়। বরণ করা হয় হেমন্ত ঋতুকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় যৌথভাবে ‘আদি নববর্ষ’ উদযাপন করে ‘বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য’ ও ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ (ডাকসু)। ওই দিন সকালবেলায় তারা রং তুলিতে ‘নবান্ন’ শিরোনামে চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করে। আদি নববর্ষ আনন্দ শোভাযাত্রা এবং দিনব্যাপী গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে আসা দেশীয় ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রিরও আয়োজন ছিল। এর মধ্যে বিভিন্ন বাহারি পিঠাপুলি তো ছিলই সঙ্গে নকশীকাঁথা, কাঠের পুতুল, তাঁতের শাড়ি, সুতার তৈরি রঙিন হাতপাখা ও অন্যান্য পণ্যও ছিল।
আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ধারণকারী সংগীতশিল্পীদের অংশগ্রহণে ছিল ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, মুর্শিদি, হাসন রাজা, শাহ্ আব্দুল করিম, আব্দুল আলীম, লালন ফকিরের গান। পাশাপাশি ছিল মারমা ও ত্রিপুরা নৃত্য। দিনব্যাপী এই আয়োজনের মধ্যে মনোমুগ্ধকর সংগীতসন্ধ্যায় আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। বেশ ভালো লেগেছে আবহমান বাংলার এই সংস্কৃতির সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যেতে।
সকালে আঁকা চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মগুলো প্রদর্শনীর জন্য রাখা ছিল। অপূর্ব সুন্দর সব ছবি। সম্ভবত প্রায় সবগুলো জলরঙে আঁকা। ছবিগুলোতে আবহমান কৃষিভিত্তিক বাংলার গ্রামীণ কৃষিজীবন ফুটে উঠে। আমার শিশু-কিশোরবেলাটা যেহেতু জেলা শহরে কেটেছে আর তখনও গ্রামগুলোর শহর হয়ে উঠার তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়নি, তাই শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাফেরা করতে করতে আমরা ধান বোনা, ধান বড় হওয়া এবং ধান কাটার দৃশ্য দেখতে পেতাম। এখন নগরায়ণের ভিড়ে সেই সব অলীক কল্পনামাত্র। শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবিতে দেখা গেল, একজন নারী প্রিন্টের রঙিন সুতি শাড়ি পড়ে কুলায় ধান উড়িয়ে ‘পাতান ধান’ ঝাড়ছেন। ধান মাড়াই শেষে কিছু ধান এমন থাকে যেগুলাের মধ্যে শুধুই খোসা, এর ভেতরে কোন চাল থাকে না। এই ধানকেই একেক অঞ্চলে একেক নামে ডাকে। আমাদের এলাকায় এই ধান ‘পাতান ধান’ নামে পরিচিত। ধান তোলার পর পাতান ধান আলাদা করার এই দৃশ্য চিরায়ত। অপূর্ব সুন্দর এই দৃশ্যটি শিল্পী তার তুলির আঁচড়ে অসম্ভব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ঘুরে ঘুরে তিন-চারবার ওই ছবি দেখলাম। আর একবার ক্যামেরায় ক্লিক করে ছবিটা তুলে ফেললাম। তবে পুরাে ছবিটা এইখানে দিতে চাই না, কারণ এই ছবিতে শিল্পী তার নাম উল্লেখ করেননি। আর নিশ্চয় এত সুন্দর ছবিটি তিনি বিক্রি করবেন। আর খুব চড়া মূল্যেই কোন একজন শিল্পবোদ্ধা এই ছবিটি কিনে নেবেন।
আর একটা ছবিতে চিত্রশিল্পী ধান কাটার দৃশ্য রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, হেমন্তের পাকা ধানের ক্ষেত। ধানের ক্ষেতের একটা অংশে ধানগাছ কিছুটা কেটে কৃষক নিচে রেখেছেন। আর কিছু অংশের ধান এখনও কাটা হয়নি। মাঝখানে জমির আইল। পাশের জমিতে কিছু ধানগাছ কাটার পর কৃষক রেখেছেন। কিছু অংশে আঁটি বাঁধা হয়েছে। আর কিছু ধানগাছ আছে যেগুলো সাদা শার্ট পরিহিত পুরুষ কৃষকেরা কাটছেন। একজন নারী কৃষকও আছেন। তিনিও ধান কাটার কাজের সঙ্গে যুক্ত। ওপাশে ধান বোঝাই দু্টি গরুর গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন একজন গাড়োয়ান ও একজন রাখাল। পুরো ছবিটি অপূর্ব সুন্দর। রংতুলিতে আঁকা হলেও পুরো দৃশ্যটি খুবই মনোমুগ্ধকর এবং আমার খুবই চেনা দৃশ্য। এখানে নারী এবং পুরুষ উভয় কৃষকের উপস্থিতি দেখা যায়; যা চিরায়ত বাংলার এক শাশ্বত দৃশ্য।
আর একটি ছবিতে ধান কাটার পরের দৃশ্য। কৃষকেরা গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের কাজ করছেন। কেউ কেউ ধানের গাছগুলাে (ধান ছড়ানোর পরে যার নাম বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নাম হয় যেমন—চারা, আড়ি, নাড়া ইত্যাদি) আঁটি বাঁধছেন। কেউ বা ধান ছাড়ানোর কাজ করছেন। কেউ বা আঁটিগুলোকে গুছিয়ে রাখছেন। দূরে ছোট শিশুরা খেলছে। কোন কোন ছোট শিশু শুকনো ধানগাছের এই আঁটি মাখায় করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে যাচ্ছে। পাশেই সবুজ ঘাসের মাঠ। নীল আকাশ আর গ্রামের ছোট্ট ইট, টিনের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাড়ির সামনে আছে গাছপালা। এই ছবিটিও অপূর্ব সুন্দর। এটিতে শিল্পীর নাম লেখা ছিল না বলে চিত্রশিল্পীর নাম উল্লেখ করতে পারছি না। আর এটিও যেহেতু চিত্রশিল্পীর কাছ থেকে কোন গুণী শিল্পবোদ্ধা অনেক বেশি দামে কিনে নেবেন তাই পুরো ছবিটি পোস্ট করতে পারছি না।
আর একটি ছবিতে দেখা যায়, ধানের নাড়া দিয়ে তৈরি ছোট্ট মাটির ঘর। ঘরের সামনে বারান্দায় ঢেঁকি রাখা। সেই ঢেঁকিতে ধান ভানছেন দুজন নারী। এই ধান থেকেই তৈরি হবে স্বাস্থ্যসম্মত চাল যা দিয়ে কৃষক ভাত খাবেন। সামনে একজন নারী কৃষক কুলায় ধান ঝাড়ছেন। দুটো মোরগ ধান কুড়িয়ে খাচ্ছে। তিনজন পুরুষ কৃষক নেংটি পরে ধানের নাড়াগুলোকে একসাথে সাজিয়ে রাখছেন। তৈরি করছেন নাড়ার পালা। দূরে নীল আকাশে পাখিরা উড়ছে। বাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে নদীর পানি। গাছপালা ঘেরা চিরায়ত বাংলার এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। দেখে মন জুড়িয়ে যায়। শিল্পীর নাম স্বাক্ষর করা থাকলেও এমনভাবে করা যে বোঝা যাচ্ছে না, তাই নামটি বলতে পারছি না। আর সংগত কারণেই ছবিটা পুরো দিতে পারছি না।
আর একটি ছবিতে দুজন কৃষানি কুলা দিয়ে উড়িয়ে ধান বাছাইয়ের কাজ করছেন। আর একটি ছবিতে নদীর তীরে থাকা ধানক্ষেত থেকে ধান কাটার পর লাইন ধরে কৃষকেরা ধান দিয়ে ঘরে ফিরছেন। পরে সেগুলোই মাড়াই হবে। অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্য। আর একটি ছবিতে একজন পুরুষ কৃষক হাস্যোজ্জ্বল মুখে একমুঠো ধান ধরে আছেন। এ দৃশ্য অপূর্ব সুন্দর। এই এক মুঠো ধান ফলাতে কৃষককে ঘাম ঝরাতে হয়েছে দিনের পর দিন। প্রথমে বীজতলা তৈরি। এরপর বীজ তৈরি। জমি প্রস্তুত। সেই জমিতে বীজ বোনা, বীজ থেকে চারাগাছ বড় করা, নিয়মিত জমির যত্ন নেওয়া, সেচের মাধ্যমে পানি দেওয়া। সবশেষে ধান পাকলে ধান কেটে ঘরে তোলা। ধান থেকে চাল তৈরি এবং সব শেষে সেই চাল ফুটিয়ে ভাত খাওয়ার এই প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কখনোই সেভাবে ভাবি না তাই কৃষককে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠাবোধ করি। 
বাংলাদেশে নারী এবং পুরুষ সেই আদিকাল থেকে সমানতালে কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীনকালে নারীই প্রথম বীজ থেকে শস্য উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করে। নারীই প্রথম বীজ সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে। নারীর হাতেই ছিল মূল শস্য ভাণ্ডার। যখন থেকে পুুরুষ তার সম্পদের মালিকানার বিষয়ে সচেতন হয় তখন থেকে ধীরে ধীরে কৃষিতে নারীর কর্তৃত্ব কমতে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির প্রায় ৭৪ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। সংখ্যায় এই পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫ লাখের বেশি, যা দেশের মোট কৃষি শ্রমশক্তির (২ কোটি ৫৬ লাখ) একটি বড় অংশ। ২০২৩-২৪ সালের জরিপ অনুসারে, দেশের মোট নারী কর্মসংস্থানের ৫৮ শতাংশ কৃষি খাতের সঙ্গে জড়িত। যখন আমি শিল্পীদের আঁকা ছবিগুলো দেখছি তখন আমার নারী কৃষকের বিষয়টি মাথায় আসে। নারীরা কৃষিকাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। নারী কৃষিকাজের সবগুলো সেক্টরেই কাজ করে। কোনটা হয়ত বেশি কোনটা হয়ত কম। কিন্তু নারী এবং পুরুষ কৃষক সমানতালেই কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু যখন চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবিগুলো দেখলাম তখন দেখলাম নারী কৃষকের সংখ্যা মূল সংখ্যার অনেক কম। তবু যে চিত্রশিল্পীর তুলিতে নারী কৃষক আছে এই তো বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে চিরায়ত সংস্কৃতির ছোঁয়া পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। পাশাপাশি এই ছবির প্রদর্শনী আমার মন ভরিয়ে দিয়েছে।
কেন যেন মূল জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের নারীরা থাকে সবখানে; খুব কম!
