রক্তের কালিতে লেখা গাজায় গণহত্যার অজানা আখ্যান
মাইসারা জান্নাত
প্রকাশ: ০০:৫৭, ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৩:০০, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
ওয়াসিম সাঈদ। ছবি: আল-জাজিরা
গাজার আকাশ এখন আর নীল নেই। বারুদের ধোঁয়ায় তা ধূসর হয়ে গেছে। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ ও হাহাকার। মৃত্যু সেখানে নিত্যদিনের সঙ্গী। এই চরম অমানবিকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও জীর্ণ এক তাঁবুর নিচে মোমবাতির আলোয় বসে আছেন ২৪ বছর বয়সী ওয়াসিম সাঈদ। তার হাতে অস্ত্র নেই, আছে শুধু একটি কলম। ইসরায়েলের নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী হিসেবে তিনি লিখে চলেছেন চোখে দেখা সব গল্প, যেন তা রক্তের কালিতে লেখা গাজায় গণহত্যার অজানা আখ্যান।

তাঁবুর ভেতর ওয়াসিম সাঈদ। ছবি: আল-জাজিরা
ওয়াসিম সাঈদ তার বইটির নাম দিয়েছেন ‘উইটনেস টু দ্য হেলফায়ার অব জেনোসাইড’ তথা গণহত্যার নরককুণ্ডের সাক্ষী।
গত দুই বছর ধরে চলা বিরামহীন যুদ্ধ, বারবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, অনাহার ও ধ্বংসলীলার এক জীবন্ত দলিল এই বইটি। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়াসিম জানিয়েছেন, তার বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামের কথা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ কিংবা হাড়কাঁপানো শীত, বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হওয়া তাঁবুর জীবন এখন তাদের নিয়তি। তবুও এই চরম দুর্দশার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অসম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা।

ওয়াসিম সাঈদের আগের লেখা বইয়ের কপি। ছবি: আল-জাজিরা
ওয়াসিমের বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে কোনো না কোনো ব্যক্তি, স্থান বা স্মৃতির নামে। তিনি চান না এই নামগুলো হারিয়ে যাক। তার এই লেখার পেছনে কোনো সহানুভূতির প্রত্যাশা নেই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আপনাদের সহানুভূতির প্রয়োজন আমার নেই। আমার এমন এক জাগ্রত বিবেকের প্রয়োজন যা পচে যায়নি, এমন মানুষ চাই যারা পাথরে পরিণত হয়নি। আমি এমন পাঠক চাই না, যারা বইটি বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে চুমুক দিতে চলে যাবে।’
ইসরায়েলি বাহিনী গাজার প্রায় সমস্ত অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট নেই। তাই রাতের আঁধারে মোমবাতির আলোই ওয়াসিমের একমাত্র ভরসা। তিনি ক্ষোভ ও হতাশা থেকে মুক্তি পেতেই লিখতে শুরু করেছিলেন। শুরুতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখলেও শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন, তার চেয়েও ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছেন অনেকে। এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানাবে।

লেখায় ব্যস্ত ওয়াসিম সাঈদ। ছবি: আল-জাজিরা
বইটির একটি অধ্যায়ের নাম ‘দ্য আনটোল্ড স্টোরিজ’ তথা না বলা গল্প। এখানে তিনি সেসব মানুষের কথা লিখেছেন, যারা নীরবে নিহত হয়েছেন, যাদের দাফন হয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে। তাদের শেষ মুহূর্তের ভয় ও আর্তনাদ লিপিবদ্ধ করেছেন ওয়াসিম।
তার কাছে প্রতিটি পৃষ্ঠা বিস্মৃতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ। তিনি বিশ্বাস করেন, গল্পগুলো নথিবদ্ধ না হলে তা হারিয়ে যাবে। তিনি একজন সাক্ষী হিসেবে কিছু রেখে যেতে চান।

কফি তৈরি করছেন ওয়াসিম সাঈদ। ছবি: আল-জাজিরা
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল ও ঘরবাড়ি আজ ধ্বংসস্তূপ। এই মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়ে ওয়াসিম মাঝে মাঝে লেখার সার্থকতা কিংবা বেঁচে থাকার অর্থ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু মানুষের স্বভাবই হলো আশার আলো খোঁজা।

লিখছেন ওয়াসিম সাঈদ। ছবি: আল-জাজিরা
তিনি বলেন, ‘মানুষের স্বভাবই হলো আশার আলো খুঁজে ফেরা। অনাহার ও মৃত্যুর এই বিভীষিকার মধ্যেও আমি বিশ্বাস করি লেখার গুরুত্ব আছে। আমার পক্ষে এটুকু লেখা সম্ভব হয়েছে। বাকিটা এখন রক্ত দিয়ে লেখা হচ্ছে। যদি বেঁচে থাকি, তবে এই গল্প শেষ করব।’
