দগ্ধ শরীরে ছোট্ট মেয়ের জীবন সাজানোর লড়াই
মাইসারা জান্নাত
প্রকাশ: ০০:৪৩, ২১ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০১:০৭, ২১ নভেম্বর ২০২৫
এলহাম আবু হাজ্জাজ। ছবি: আল-জাজিরা
গাজার ছোট্ট মেয়ে এলহাম আবু হাজ্জাজ। ইসরায়েলি হামলায় গাজা শহরে নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ার আগে শেষ স্মৃতি হিসেবে সে মনে করতে পারে, তার মা তাকে ধরে রেখে প্রার্থনা করছিলেন। সেই হামলায় সে তার মা-বাবা দুজনকেই হারায়। নয় বছর বয়সী এলহাম এখন গাজার হাজার হাজার শিশুর মধ্যে একজন, যাদের পোড়া শরীর নিয়ে নতুন করে জীবন গড়তে হচ্ছে।
হামলার শিকার হওয়ার পর হাসপাতালের বিছানায় যখন জ্ঞান ফিরে, তখন এলহাম নিজেকে এক অন্য জগতে আবিষ্কার করে। পেটের ওপর অদ্ভুত এক যন্ত্র বসানো। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।
আল-জাজিরাকে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে সে বলে, আমার শরীর স্পর্শ করলাম এবং বুঝলাম পুরোটাই পুড়ে গেছে। ডাক্তার আমার পাশেই ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার বাবা মা কোথায়? তিনি কোনো উত্তর দেননি। সেই নীরবতাই ছিল সব প্রশ্নের জবাব।

ভাইয়ের সঙ্গে এলহাম আবু হাজ্জাজ। ছবি: আল-জাজিরা
ইসরায়েলের এই নিষ্ঠুর সামরিক অভিযানের শিকার কেবল এলহাম একা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজার প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এমন আঘাত পেয়েছেন, যা তাদের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার তিনশ ৫০ জনেরও বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছেন। হৃদয়বিদারক তথ্য হলো, গাজায় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এমন পোড়া রোগীদের প্রায় সত্তর শতাংশই শিশু, যাদের অনেকের বয়স পাঁচ বছরেরও নিচে। বোমা বিস্ফোরণের আগুনের লেলিহান শিখা তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে।
আয়নায় নিজের দিকে তাকালে এলহামের বুকটা কেঁপে ওঠে। সে বলে, ‘হে আল্লাহ, আমার এই ক্ষতগুলোর দিকে তাকাও। এগুলো খুব ভয়ানক।’
ঘাড়, হাত আর পায়ের গভীর ক্ষতচিহ্নগুলো তাকে প্রতিনিয়ত সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। দাদা যখন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, তার বাবা-মা জান্নাতে অপেক্ষা করছেন, তখন সে নিজেকে মিথ্যা প্রবোধ দিত, তারা নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন। কিন্তু যেদিন দাদা তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন, সেদিন এলহাম বুঝতে পারল তার মাথার ওপর আর বাবা-মায়ের ছায়া নেই। কান্নায় ভেঙে পড়া ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।

এলহাম আবু হাজ্জাজ এবং তার দাদি। ছবি: আল-জাজিরা
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এতিমদের আশ্রয়ের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-কে সুরা দোহার ৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি, অতঃপর আপনাকে আশ্রয় দেননি?’ এলহামও আজ তার দাদা-দাদি এবং বেঁচে যাওয়া ভাইয়ের মাঝে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝে ভাই ও আত্মীয়দের জীবিত দেখে তার মনে সামান্য স্বস্তি ফিরেছে। সে বলে, ভাইকে দেখে আমি কিছুটা খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য আমার হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল।

এলহাম আবু হাজ্জাজ, তার দাদি ও ভাই। ছবি: আল-জাজিরা
এখন আঁকাআঁকিই এলহামের একমাত্র মানসিক আশ্রয়। রং পেন্সিলের আঁচড়ে সে তার হারানো শৈশব আর ঘরকে ফিরিয়ে আনতে চায়।
সে বলে, ছবি আঁকলে আমি সব ভুলে থাকি। তার আঁকা সর্বশেষ ছবিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িটি নেই। সেখানে সে এঁকেছে নতুন করে গড়ে তোলা একটি বাড়ি, একটি দোলনা আর একটি গাছ। যে গাছটি তার বাবা নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন, সেই গাছটিকে সে ছবির ক্যানভাসে আবার পুনরুজ্জীবিত করেছে।
এভাবেই রঙের ছোঁয়ায় সে তার বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, বাঁচিয়ে রাখতে চায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া তার স্বপ্নগুলোকে।
