গ্রহাণুতে ‘ট্রিপ্টোফ্যান’ খুঁজে পেল বিজ্ঞানীরা
বিজ্ঞান ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬:৪০, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
ছবি সিএনএন
মানবদেহের জন্য অপরিহার্য এবং জটিল অ্যামিনো অ্যাসিড ট্রিপ্টোফ্যান, যা পৃথিবীতে সচরাচর জীবদেহেই তৈরি হয়, এবার প্রথমবারের মতো পাওয়া গেল দূরবর্তী গ্রহাণু বেণ্নুতে। নাসার ওসিরিস–রেক্স মিশনের মাধ্যমে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই যুগান্তকারী তথ্য জানিয়েছেন। সিএনএনের বিজ্ঞান সংবাদদাতা জ্যাকোপো প্রিসকোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ আবিষ্কারের বিস্তারিত।
বেণ্নু থেকে আনা এই নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছায় ২০২৩ সালে। মাত্র ৪.৩ আউন্স (১২১.৬ গ্রাম) পাথর ও ধূলিকণা সংগ্রহ করতে নাসা ২০২০ সালে গ্রহাণুটির উপর অবতরণ করেছিল। পৃথিবীতে ফেরার পর নাসা বিশ্বজুড়ে গবেষকদের কাছে নমুনার অংশবিশেষ বিতরণ করে। এর মধ্য থেকেই পাওয়া গেছে জীবনের সম্ভাব্য বীজ—ট্রিপ্টোফ্যান।
মহাশূন্যে জীবনের ‘রেসিপি’ তৈরি হয়েছিল?
নতুন এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও জোরদার করেছে যে, জীবনের মৌলিক উপাদানগুলো হয়তো পৃথিবীতে নয়—বরং মহাশূন্যেই তৈরি হয়েছিল।
নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অ্যাস্ট্রোকেমিস্ট হোসে আপন্তে বলেন—“ট্রিপ্টোফ্যান খুব জটিল অ্যামিনো অ্যাসিড। এর আগে কোনো উল্কা, ধূমকেতু বা মহাশূন্যের নমুনায় এটি পাওয়া যায়নি। এটি মহাশূন্যেই স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছে—এ তথ্য জীবন শুরুর ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।”
এই পর্যন্ত বেণ্নুর নমুনায় পাওয়া গেছে মোট ৩৩ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড, যার মধ্যে ১৪টি ইতোমধ্যে জীবদেহে ব্যবহৃত প্রোটিন–নির্মাণকারী অ্যামিনো অ্যাসিডের সঙ্গে মিলে যায়। নতুন আবিষ্কারের ফলে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়াল ১৫-এ।
ট্রিপ্টোফ্যান একটি এসেনশিয়াল আমাইনো এসিড অর্থাৎ মানবদেহ তা নিজে তৈরি করতে পারে না—খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।
৪.৫ বিলিয়ন বছরের ‘টাইম ক্যাপসুল’ বেণ্নু
মাত্র এক–তৃতীয়াংশ মাইল চওড়া বেণ্নু গ্রহাণুটি মূলত একটি বৃহৎ মহাজাগতিক দেহের ভাঙা অংশ, যার বয়স আনুমানিক ৪.৫ বিলিয়ন বছর। এর গঠন সৌরজগতের শুরুর দিকের পরিবেশ ও রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
নাসার তথ্য অনুযায়ী—বেণ্নু ১.৭৫ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর কাছে ঘুরছে
২১৮২ সালে এটি পৃথিবীতে আঘাত হানার সম্ভাবনা ০.০৩৭% (১-এ ২৭০০)
গ্রহাণুটিতে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরির পূর্বধাপ অ্যামোনিয়া, নানা খনিজ, লবণ, কার্বনেটসহ জীবনের উপাদানসমূহ বহু আগেই ছিল
ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার প্ল্যানেটারি সায়েন্স অধ্যাপক ডান্তে লরেত্তা বলেন, “ওসিরিস–রেক্স যে নমুনা এনে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ অক্ষত। এরকম নমুনা পৃথিবীতে পতিত উল্কার ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পাওয়া যায় না। বেণ্নুর মধ্যে আমরা যেন সূর্যজগতের শুরুর রসায়নের খণ্ডচিত্র দেখতে পাচ্ছি।”
জীবনের উপাদানগুলো যেন ‘অসমাপ্ত জিগস পাজল’
গবেষণার প্রধান লেখক এঞ্জেল মোখারো জানান, “এসব উপাদান জীবনের টুকরো, তবে এগুলো এখনো একত্রিত হয়নি। তারা যেন জিগস পাজলের অংশ। এর মানে, মহাশূন্য নিজেই জীবনের নির্মাণ–উপাদান তৈরি করেছে এবং এই টুকরোগুলো পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে উল্কাপাতের মাধ্যমে।”
এর আগে জাপানের হায়াবুসা–২ মিশন রিউগু গ্রহাণু থেকে আনা নমুনায়ও অ্যামিনো অ্যাসিড পেয়েছিল বিজ্ঞানীরা। আরও নানা উল্কাপিণ্ডেও মিলেছে জীবনের উপাদান। ফলে আশঙ্কা নয়—এখন বিজ্ঞানীদের অনুমান ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে: জীবনের রাসায়নিক উপাদানগুলো মহাশূন্য থেকেই পৃথিবীতে এসেছে।
মরোভিৎসের পুরনো তত্ত্ব আবারও আলোচনায়
খ্যাতনামা জীবনের উৎস–গবেষক হ্যারল্ড মরোভিৎস বহুদিন আগে বলেছিলেন, জীবদেহে থাকা কিছু অণু আসলে ‘মলিকিউলার ফসিল’—সৌরজগতের শুরুর সময়ের রসায়নের স্মৃতি বহন করে।
কার্নেগি ইনস্টিটিউশনের জর্জ কোডি বলেন— “বেণ্নুতে ট্রিপ্টোফ্যান পাওয়া সেই ধারণাকেই আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। সৌরজগতের জন্মলগ্নে যে রসায়ন চলেছিল, সেটাই জীবনের মৌলিক অণুগুলোর জন্ম দিয়েছে—এটি খুবই শক্তিশালী ইঙ্গিত।”
কেন প্রয়োজন মহাশূন্য থেকে আনা ‘অক্ষত নমুনা’?
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক সারা রাসেল জানান—“উল্কা পৃথিবীতে পতনের সময় প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে ভেতরের লবণ, খনিজ, জৈব যৌগের ক্ষতি হয়। তাই সত্যিকারের উত্তর পেতে মহাশূন্য থেকে অক্ষত নমুনা আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তার মতে, ট্রিপ্টোফ্যান বিশেষভাবে ‘অপ্রত্যাশিত’ আবিষ্কার, কারণ এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের ধাক্কা সহ্য করতে পারে না।
উপসংহার: মহাশূন্যই কি জীবনের সরবরাহকারী?
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির কেট ফ্রিম্যান বলেন— “প্রাচীন পৃথিবীর জন্য অ্যাস্টারয়েডই ছিল ‘গ্রোসারি ডেলিভারি সার্ভিস’। তারা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অগণিত অণু আমাদের গ্রহে পৌঁছে দিয়েছে।”
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বেণ্নুতে ট্রিপ্টোফ্যানের উপস্থিতি মহাকাশ–নির্ভর জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে ভবিষ্যতে গবেষণাকে আরও গতিশীল করবে।
