শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

গজবে ধ্বংস হয়েছে যেসব জাতি

মুফতি হাসান আল মামুন

প্রকাশ: ১৮:০৩, ২১ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৮:০৯, ২১ নভেম্বর ২০২৫

গজবে ধ্বংস হয়েছে যেসব জাতি

মাদইয়ান শহরের ধ্বংসাবশেষ। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাস আমাদের জন্য জীবন্ত দর্পণ। এতে রয়েছে সতর্কবার্তা। পৃথিবীর বুকে একসময় দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছে বহু শক্তিশালী জাতি, যাদের শক্তি ও ঐশ্বর্য ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু তাদের জৌলুস বা ক্ষমতা তাদেরকে রক্ষা করতে পারেনি। সীমালঙ্ঘন ও ঔদ্ধত্যই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তাদের প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি।’ (সুরা আল আনকাবুত ৪০)  আয়াতে বর্ণিত এই সতর্কবাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহর বিধান অমান্য করে কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেসব অভিশপ্ত জাতির ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করে আমাদের আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসা খুবই জরুরি। পবিত্র কোরআনের আলোকে সেসব ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

মাদইয়ান জাতি : তারা ছিলেন মুসলিম জাহানের জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর তৃতীয় স্ত্রী কাতুরার ঘরের পুত্র মাদইয়ানের বংশধর। আর হজরত শোয়াইব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন মাদইয়ান সম্প্রদায়ের কাছে। ধারণা করা হয়, বর্তমান সিরিয়ার মুয়ান নামক স্থানে হজরত শোয়াইব (আ.)-এর কওমের বসবাস ছিল। 

মাদইয়ানবাসী পার্থিব লোভ-লালসায় এতটাই মত্ত হয়েছিল যে, তখন তারা পারস্পরিক লেনদেনের সময় ওজনে কম দিয়ে মানুষের হক আত্মসাৎ করত। দুর্নীতি, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও মজুদদারির মতো জঘন্য অন্যায় কাজ তাদের সমাজের মধ্যে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এসব পাপে তারা এমনভাবে লিপ্ত ছিল, তারা কখনও মনে করত না, এসব কাজ অত্যন্ত জঘন্য বা গর্হিত। বরং তারা এসবের জন্য গর্ববোধ করত। অবশেষে তারা যখন সীমালঙ্ঘনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল তখন আল্লাহর গজব এসে গেল এবং তারা ধ্বংস হলো।

আদ জাতি : আদ জাতির লোকেরা ছিল উন্নত। নির্মাণশিল্পে তারা ছিল জগৎসেরা। তারা সুরম্য অট্টালিকা ও বাগান তৈরি করত। তাদের তৈরি ইরামের মতো অনিন্দ্য সুন্দর শহর পৃথিবীর আর কোথাও ছিল না। তারা অঙ্কন শিল্পেও ছিল দক্ষ। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা যেমন অগ্রসর ছিল, তেমনি সংস্কৃতিতেও অনন্য। আদরা ভুলে গেল যে, আল্লাহ বা স্রষ্টা বলতে কেউ আছেন। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা যে আল্লাহই তাদের দিয়েছেন, তাও তারা বেমালুম ভুলে গেল। ফলে তারা অহংকারী হয়ে উঠল এবং সত্যিকারের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ল।

আদ জাতির লোকদের সতর্ক করার জন্য আল্লাহ হজরত হুদ (আ.)-কে দুনিয়ায় পাঠালেন। হজরত হুদ (আ.) আদ জাতির লোকদের গর্ব পরিত্যাগ করার আহ্বান জানালেন এবং আল্লাহর ইবাদত করার উপদেশ দিলেন। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনার কথাও বললেন। কিন্তু লোকেরা হুদ (আ.)-এর কথা শুনল না, বরং তারা তার কথা প্রত্যাখ্যান করল। তাকে বোকা ও মিথ্যাবাদী বলে গালাগাল দিল। নবীর প্রতি এরূপ অন্যায় আচরণে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন। ফলে আদদের এলাকায় দেখা দিল প্রচণ্ড খরা। এতে তিন বছর তারা দুর্ভিক্ষের মধ্যে কাটাল। তারপরও তাদের স্বভাব-চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হলো না। এবার সেখানে শুরু হলো ভয়ানক ঝড়। এই ঝড় সাত রাত ও আট দিন ধরে চলল। ফলে গোটা আদ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। আল্লাহ তার রহমতে হজরত হুদ (আ.) ও তার অনুসারীদের রক্ষা করলেন।

লুত (আ.)-এর জাতি : বিকৃত পাপাচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল লুত (আ.)-এর জাতি। ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে এই জাতিটির বসবাস ছিল। এই জাতির কেন্দ্রীয় শহর ছিল ‘সাদুম’ নগরী। সাদুম ছিল সবুজ শ্যামল এক নগরী। কারণ এখানে পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। ফলে ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর এবং শস্যে ভরপুর। এমন প্রাচুর্যময় জীবনযাত্রা বেপরোয়া করে তোলে তাদের। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে তাদের মধ্যেই সর্বপ্রথম সমকামিতার প্রবণতা দেখা দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই জঘন্য অপকর্ম তারা প্রকাশ্যে করে আনন্দ লাভ করত।

অবশেষে একদিন আল্লাহর গজব নাজিল হয় ওই পাপাচারী জাতির ওপর। তাদের ওপর মহাপ্রলয় নেমে আসে। এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে। পাশাপাশি আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ওই মহাপ্রলয়ের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। ওই জনপদের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান।

সালেহ (আ.)-এর জাতি : সালেহ (আ.) এর সামুদ জাতি সামুদ শিল্প ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অতুলনীয় ছিল। আদ জাতির পর তারাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী জাতি। কিন্তু তাদের জীবনযাপনের মান যতটা উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, মানবতা ও নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিল। একদিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে পাথর খোদাই করে করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে সমাজে কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটছিল। অন্যায় ও অবিচারে সমাজ জর্জরিত হতে থাকে। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত সালেহ (আ.) যে সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন, তাতে নিম্নশ্রেণির লোকেরাই সাড়া দেয়। হিজর ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল। এর ধ্বংসাবশেষ মদিনার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমান শহর আল-উলা থেকে কয়েক মাইল ব্যবধানে তা দেখা যায়।

সালেহ (আ.) সারা জীবন তাদের হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে অল্প কিছু সঙ্গী ছাড়া গোটা জাতি তার অবাধ্যই থেকে যায়। এক পর্যায়ে তারা দাবি করে, আপনি যদি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী মাদি উট বের করে দেখান। এটি দেখাতে পারলে আমরা আপনার ওপর ঈমান আনব। সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর কুদরতে পাহাড় থেকে একটি অদ্ভুত রকমের মাদি উট বের হয়। তা দেখে কিছু লোক ঈমান আনে। কিন্তু তাদের সরদাররা ঈমান আনেনি, বরং তারা সে মাদি উটকে হত্যা করে ফেলে। এতে সালেহ (আ.) তার জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসার ঘোষণা দেন। তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে, তিন দিন পরই আল্লাহর আজাব তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।

নির্ধারিত সময়ে আসমানি আজাব এসে অবিশ্বাসীদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড শব্দে তাদের নাস্তানাবুদ করে ফেলে। বজ্রপাতের ভয়ংকর শব্দে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে যায়। অবশেষে তাদের অপমৃত্যু ঘটে।

নুহ (আ.)-এর জাতি : নুহ (আ.) এর জাতি মূর্তিপূজা করত। আল্লাহতায়ালা নুহ (আ.)-কে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করতে বলেছেন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়ার পরও তারা ঈমান আনেনি। তিনি তার জাতিকে সত্যের পথে আনতে দীর্ঘ ৯৫০ বছর নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা নুহ (আ.)-এর দাওয়াত তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাকে বলেছিল, ‘হে নুহ! যদি তুমি বিরত না হও, তবে পাথর মেরে তোমার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’

বহু চেষ্টায় অল্পসংখ্যক মানুষ তার পথে এসেছিল। তার সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তার কথায় কর্ণপাত করেনি। নুহ (আ.) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ংকর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তার জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন সেই জাতিকে গ্রাস করেছিল, যেই প্লাবন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ (আ.)-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল।

মুসা (আ.)-এর জাতি : নিজেকে খোদা দাবি করেছিল ফেরাউন। তার কাছে ঈমানের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন মুসা ও হারুন (আ.)। বিনিময়ে মুসা (আ.)-কে হত্যা করতে মনস্থির করে ফেরাউন। সদলবলে ফেরাউন একদিন মুসা (আ.)-কে ধাওয়া করে। তিন দিকে ঘেরাও হওয়া মুসা (আ.)-এর দলের সামনে ছিল উত্তাল সাগর। আল্লাহর হুকুমে সাগরে পথ সৃষ্টি হয়। নিজের দল নিয়ে মুসা (আ.) ওই পথ দিয়ে সমুদ্র পার হয়ে যান। কিন্তু সাগরে ডুবে মারা যায় ফেরাউন। আল্লাহ তাকে পৃথিবীবাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে দিয়েছেন। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় সাগরে নিমজ্জিত থাকার পরও তার লাশে কোনো পচন ধরেনি।

অতীতের এসব কাহিনী বুদ্ধিমানদের জন্য সতর্কবার্তা। আজ আমাদের সমাজেও সেই একই পাপাচার ও অন্যায়ের কালো ছায়া বিস্তার লাভ করেছে, যা সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর পতনের মূল কারণ ছিল। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই এবং নিজেদের শুধরে না নিই, তবে আমাদের পরিণতিও তাদের মতো ভয়াবহ হতে পারে। মহান আল্লাহ তার বান্দাদের সংশোধনের জন্য অবকাশ দেন। কিন্তু যখন পাপের সীমা অতিক্রান্ত হয় তখন তার পাকড়াও অত্যন্ত কঠোর হয়। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের উচিত সকল প্রকার অন্যায় পরিহার করে আল্লাহর পথে ফিরে আসা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সঠিক পথ বোঝার এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার তওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

খালেদা জিয়ার অবস্থা বিদেশ নেওয়ার মতো স্থিতিশীল নয় : ফখরুল
তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান