ভূমিকম্পে কোরআনের সতর্কবার্তা
মাইসারা জান্নাত
প্রকাশ: ১৫:৩৬, ২১ নভেম্বর ২০২৫
আল-কোরআন। ছবি: সংগৃহীত
মানুষের অকৃতজ্ঞতা, উদাসীনতা ও অন্যায় যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহতায়ালা সতর্ক করে দেন, এই পৃথিবী ও তার স্থায়িত্ব কেবল তারই ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
পবিত্র কোরআনের সুরা মুলকের ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের মিথ্যা নিরাপত্তা বোধ নিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা কি নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে নিয়েছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদেরকে জমিনে বিধ্বস্ত করে দিবেন না, যখন তা হঠাৎ থর থর করে কাঁপতে থাকবে?’
এই আয়াতের মর্মার্থ অত্যন্ত গভীর। মানুষ মাটির ওপর শক্ত ইমারত গড়ে নিজেকে সুরক্ষিত ভাবে। অথচ আল্লাহ চাইলে সেই স্থির জমিনকেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে পারেন। যখন জমিন কাঁপতে শুরু করে তখন মানুষের পালানোর কোনো জায়গা থাকে না। এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক সামান্য নিদর্শন মাত্র, যা তিনি বান্দাদের সতর্ক করার জন্য প্রদর্শন করেন।
মানুষ অনেক সময় মনে করে, বিপদ হয়তো কেবল রাতের আঁধারে আসে অথবা যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর আজাব আসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয় না। মানুষ যখন দিনের আলোয় খেলাধুলা বা পার্থিব আমোদ প্রমোদে মগ্ন থাকে ঠিক তখনই নেমে আসতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। সুরা আরাফের ৯৮ ও ৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি নিরাপদ হয়ে গেছে যে, আমার শাস্তি তাদের ওপর দিনের বেলায় আসবে না? যখন তারা খেলাধুলায় মেতে থাকবে। তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকেও নিরাপদ হয়ে গেছে? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্থ সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর কৌশলকে নিরাপদ মনে করে না।’
এখানে আল্লাহর কৌশল বলতে তার গোপন পরিকল্পনা বা শাস্তির বিধানকে বোঝানো হয়েছে, যা লোকচক্ষুর অন্তরালে সক্রিয় থাকে। যারা বুদ্ধিমান তারা কখনোই আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেদের নিরাপদ মনে করে না, বরং সর্বদা ভীত ও সতর্ক থাকে।
শাস্তি কেবল আসমান থেকে নয়, বরং পায়ের নিচ থেকেও আসতে পারে। সুরা আনআমের ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলো, আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।’
এই আয়াতটি যখন নাজিল হয় তখন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ হাদিসটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, যা বিষয়টির গুরুত্ব ও ভয়াবহতা প্রমাণ করে। প্রখ্যাত মুফাসসির শায়েখ ইস্পাহানি রহমতুল্লাহি আলাইহি এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, এখানে পায়ের নিচ থেকে আজাব আসার অর্থ হলো ভূমিকম্প ও ভূমিধস। অর্থাৎ যে মাটি আমাদের ভার বহন করে, তা যেকোনো মুহূর্তে আমাদের গ্রাস করে নিতে পারে।
আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে মানুষ ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়াকে দায়ী করে থাকে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে এর কার্যকারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুমিন বিশ্বাস করে, এই প্রাকৃতিক নিয়মগুলো মহান আল্লাহর নির্দেশেরই অধীন। যখন পৃথিবীতে পাপাচার, অনাচার এবং আল্লাহর নাফরমানি বেড়ে যায়, তখন আল্লাহতায়ালা জমিনকে প্রকম্পিত করে মানুষকে সতর্ক করেন। এটি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ডাক।
আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। নিজেদের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে আল্লাহ ও তার রাসুলের দেখানো পথে চলার দৃঢ় সংকল্প করা। কারণ একমাত্র আল্লাহই পারেন আমাদের এই ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে।
