বস্তিরা বস্তিতে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে!
প্রকাশ: ১৩:০৩, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৯:০৯, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
শোয়েব সর্বনাম
কড়াইল বস্তিতে যাদের বাসা তাদের কর্মক্ষেত্র গুলশান ও বনানী। এসব এলাকার বড় বড় অফিসগুলাতে অল্প টাকা বেতনে সিকিউরিটি গার্ড পাওয়া লাগে। আরও লাগে কাজের বুয়া। ড্রাইভার। গুলশান-বনানীতে টং দোকানদার ও হকার আছে। তাদের দোকানে হলুদ জামা পরা রিকশাওয়ালারা জিরায়। দোকানদার ও রিকশাওয়ালা উভয়ের বাসা কড়াইল বস্তি। এ এলাকার গ্যাস মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা অন্যান্য সার্ভিস প্রোভাইডার যাদের নাম আফজাল ভাই, ওরা সবাই কড়াইল থেকে আসে। ফলে, গুলশান-বনানী থাকলে কড়াইল বস্তি থাকা লাগবে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্ত এনজিওর ক্যাম্প অফিস কড়াইল বস্তিতে আগে থেকেই আছে। এখানকার লোকেদের স্যানিটেশন, হাইজিন, মেডিসিন এসব দরকারে দাতারা উদারহস্ত। এনজিওদের জরিপ চালানোর জন্য সবচেয়ে স্মার্ট গরিবদের পাওয়া যায় কড়াইলে। গরিবদের দুঃখ-কষ্টের ডকুমেন্টারি ও আর্টফিল্ম ওইখানে শ্যুটিং হয়। এসব জরিপ ও ফিল্ম দেখায়ে ফান্ড নিয়ে এসে বড়লোকরা গুলশানে ফ্ল্যাট ভাড়া করে এসি চালায়ে ঘুমায়ে থাকে। হোটেল ভাড়া করে। বিদেশিরা থাকবে হোটেলে। ব্রেকফাস্ট মিটিং শেষ হলে এরপর ভদ্র ভদ্র গরিবদের দেখতে গাড়ি নিয়ে কড়াইল ভিজিট করতে যান তারা। বস্তি হলেও সেখানে পার্কিং ব্যবস্থা ভালো। কড়াইল না থাকলে কোনখানে গিয়ে গরিবদের দুঃখ ভিজিট করবেন গুলশানে বেড়াতে আসা বিদেশিরা?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আগে ছিল মহাখালীতে ওই কড়াইল বস্তির কাছাকাছি। একবার বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থাপত্য বিভাগের একজন শিক্ষক ভূমিকম্পে ভয় পেয়ে মনে হয় কড়াইল বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করলেন। সেখানে লাইব্রেরি বানায়ে দিলেন। পানির ওপর মাচা বানায়ে শিশুদের খেলাধুলার স্পেস বানালেন। ক্যামেরা চালু করে দিয়ে মুন্নী সাহা নৌকা নিয়ে চলে গেলেন বস্তিতে। ভার্সিটিতে পোলাপান এই অধ্যাপককে ডাকতো বস্তি কবীর। ইউটিউবে দেখা যাবে, বস্তির ছেলেমেয়েগুলা ওই লাইব্রেরিতে বসে বসে আর্কিটেক্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেছে।
এইগুলা সব পুড়ে গেছে মনে হয়। কড়াইলে মাঝে মধ্যেই আগুন লাগে। অনেকের সন্দেহ, কিছু অগ্নিকাণ্ডও পরিকল্পিত। উদ্দেশ্য ভূমি দখল। ব্যবসায়ীরা মাটি ভরাট করে উঁচা বিল্ডিং বানায়ে স্কয়ার ফিট হিসেবে বেচে দেবে। ফুটপাতে গেঞ্জি ও রুফটপে বুফে বেচবে। এইটা একটা পক্ষ।
গভমেন্ট এখানে আইটি পার্ক করবে। কর্মসংস্থান হবে। এইটা আরেক পক্ষ। আর ইতিমধ্যে এখানে ক্ষুদ্রঋণ, স্যানিটেশন, গরিবত্ব বিক্রি করতেছে নন-প্রফিট এনজিও। তৃতীয় পক্ষ। তাদের লগে আছে সুশীল সমাজ, যারা অলওয়েজ গরিবদের পাশে থাকতে চায়। এই পক্ষটাই এখন পর্যন্ত পাওয়ারফুল অবস্থায় আছে। গরিবদের কোন পক্ষ এখানে কোন রোল প্লে করে না।
পত্রিকায় দেখলাম কড়াইল ইস্যু নিয়ে মানবাধিকার এনজিওগুলা গভমেন্টের সাথে এক টেবিলে বসে চা খাচ্ছে। ফলে এবারও কড়াইল বেঁচে গেল। বস্তিবাসী আরও ক্ষুদ্রঋণ পাবে সন্দেহ নাই।
একশ টাকার মিজানের হোটেলে আজকে আর খাবার নাই। বড়লোকরা কিনে নিয়ে গেছে কড়াইলের গরিবদের খাওয়ানোর জন্য। করপোরেট গ্রুপের একজন মালিক সব কাজ বাদ দিয়ে কড়াইল চলে গেছেন বস্তিবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে। সে আরও বড়লোকদের ডাকতেছে। তার বক্তব্য, কড়াইলে গরিবদের থাকতে দেওয়ার স্থায়ী ব্যবস্থা করে দেওয়া দরকার।
কড়াইল নিয়ে অনেক রাজনীতি। বস্তিতে প্রচুর ভোটার। ওরা চাইলে হিরো আলমকে ভোট দিয়ে গুলশানের এমপি বানায়ে দিতে পারে। এখন রাজনৈতিক নেতারাও তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়ে থাকবে। উপকার করে দেওয়ার চেষ্টা করবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম হাসিনা খবর পাঠাইছে তার সমস্ত গোল্ড কড়াইলের বস্তির লোকেদের দিয়ে দেওয়া হোক। যে যেভাবে চান্স পাচ্ছে কড়াইল নিয়ে পলিটিক্স খেলে দিচ্ছে আরকি।
এবারের আগুনের ঘটনা কি জানা যায় নাই। এমনিতেই লাগছে হয়তো, সিজনটা আগুনের। তবে ওদের ফায়ার ট্রেইনিং আছে। হতাহত নাই বললেই চলে। শুধু রাতটা কাটবে শীতে। কিস্তির বোঝা আরেকটু বাড়বে সপ্তাহে।
কড়াইল আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আগের মতো। আগুন যদি আরও লাগে আমরা আবারো ওদেরকে বস্তির জীবনে ফিরত যেতে হেল্প করব। মিজানের হোটেল থেকে একশ টাকার ভাত কিনে পাঠাব। যেহেতু, আমরা গরিবদের দুঃখ-কষ্ট একদম সহ্য করতে পারি না। যেহেতু, বস্তিরা বস্তিতে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।
লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
