শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

দরিদ্র মানুষের ঘর পুড়ে যাওয়া মানে বোঝেন? 

প্রকাশ: ১৯:৫৮, ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৩:২৮, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

দরিদ্র মানুষের ঘর পুড়ে যাওয়া মানে বোঝেন? 

ইমতিয়াজ মাহমুদ

২০১৭ সালে দরিদ্র আদিবাসীদের ৩০০-এর মতো ঘর পুড়িয়ে দেয় সেটেলাররা। তখন দেখেছি, দরিদ্র মানুষের ঘর পুড়ে যাওয়া মানে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা। তারিখটা মনে নেই, দিনটা শুক্রবার ছিল। সকাল দশটা কী এগারোটার দিকে আদিবাসীদের গ্রামে আগুন লাগিয়ে, ওদের সর্বস্ব পুড়েছে কি না সেটা নিশ্চিত করে সেটেলাররা। প্রশাসন কী করছিল সেকথা বললাম না। বললে লজ্জা পাবেন।

এর একদিন পর এক বন্ধুকে বলছিলাম, ভাই, ওদের ঘরের সাথে অনেকের সর্বস্ব পুড়ে গেছে। ওদের তো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নাই, নগদ টাকা কিছু থাকলে সেগুলোও পুড়েছে। টিপিক্যাল নিওলিব উন্নয়নকর্মীর মতো তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, হ্যাঁ, দরিদ্র মানুষের জন্যে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিতের প্রজেক্ট নেওয়া যায়। বুঝেন। আমি বলি, দরিদ্র মানুষের নিঃস্ব হওয়ার দুঃখের কথা। আর ওই ব্যাটা নিওলিব, ওর মনে উঁকি মারে, কিভাবে দরিদ্র মানুষের টাকাটাও পুঁজি হিসাবে লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়।

কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে পুড়ে গেছে অনেকগুলো ঘর। যাদের ঘর পুড়েছে, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই হচ্ছেন জাতে বাঙালি ধর্মে মুসলিম। কিন্তু শ্রেণিগতভাবে তাদের সাথে লংদুর দরিদ্র আদিবাসী মানুষের মৌলিক কোনো তফাৎ নেই। বিত্তবান মানুষের ঘর পুড়ে গেলে ইনস্যুরেন্স থেকে টাকা পাওয়া যায়। ওদের ধন-সম্পদ থাকে ব্যাংকে। ক্ষতি কিছুটা হয় বটে, কিন্তু সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য তাদের থাকে। কিন্তু দরিদ্র মানুষের ঘর পুড়লে ওদের সর্বস্ব যায়। সর্বস্ব মানে সর্বস্ব।

আপনারা যারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চান, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নামে কয়েকটি নীতিমালা যুক্ত করা আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ১৫ অনুচ্ছেদ। সেখানে কি বলা আছে জানেন? উদ্ধৃত করে দিচ্ছি, পড়েন।

১৫। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: 

(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; (গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং (ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার।

আমার রাষ্ট্র ১৯৭২ সালে এই নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে রাষ্ট্র এই নীতির কথা ভুলে গেছে। এটি কিন্তু সংবিধানে এখনো আছে। কবে থেকে কখন এসে রাষ্ট্র এই নীতি থেকে সরে গেছে, সেকথা আমি বলব না, আপনি খুঁজে বের করেন।

আমার রাষ্ট্র, আমাদের এই প্রাণপ্রিয় স্বদেশ যদি ১৯৭২-এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত এই নীতির পথে থাকত, তাহলে বড় শহরে হতদরিদ্র মানুষের ভিড় হয় না, দরিদ্র মানুষকে বস্তিতে মানবেতর অবস্থায় বাস করতে হয় না। আগুন তো লাগতেই পারে, আগুন তো রাজনীতি জানে না, ধর্ম মানে না। আমাদের কাজ হচ্ছে নিশ্চিত করা, যেন মানুষ কাজ পায়, দুই বেলা খেতে পায়, মাথাগোঁজার জন্যে ঘর পায়, বিপন্ন হলে সহায়তা পায়। সেটি আমরা করিনি।

১৫ অনুচ্ছেদসহ এই মূলনীতিগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অবদান আছে। কথাগুলো আমি শুনেছি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে। গণপরিষদে তিনি ছিলেন বিরোধী দলে। তিনি বলেছিলেন যে, সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত সব আলোচনার আগে ও পরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সাথে আলোচনা করতেন। তারাই তাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন। সেই অনুসারে তিনি দাবি তোলেন যে, এই নীতিটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এটি আদালতে বলবৎযোগ্য বিধান হিসেবে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের সদস্যরা এই বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে তো রাজি হলেন, কিন্তু কমিটির প্রধান ড. কামাল হোসেন কিছুতেই এই বিধান আদালতে বলবৎযোগ্য করতে রাজি নন। কেন? কারণ, তাহলে প্রশাসনিক অসুবিধা হবে ইত্যাদি। প্রতিবাদে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবিধানে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন।

কড়াইলে আগুন লাগা প্রসঙ্গে সংবিধান, ইতিহাস ইত্যাদি এসব কেন বলছি? কারণ, সংবিধান কোনো বিমূর্ত গ্রন্থ নয়, এর বিধানগুলো, নীতিমালা এই সবকিছুই আমাদের জীবন স্পর্শ করে। ১৯৭২ সালের সংবিধান, যেটি তৈরি করেছিলেন আমাদের অগ্রজ পূর্বপুরুষেরা, তারা নেহায়েত পকেট থেকে বের করে একটা বই লিখে ফেলেননি। সংবিধানে সমাজতন্ত্র নামে যে একটি মূলনীতি আছে, সেটি অর্থহীন কাগুজে কথা নয়।

আমরা যে বলি ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই সংবিধান পেয়েছি? এটি কোনো বাগাড়ম্বর নয়। আক্ষরিকভাবেই এই কথাটি সত্যি। কমিউনিস্টরা কেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন? কারণ, তারা জানেন যে, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কখনো বৈষম্যমুক্ত হবে না। কেননা, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র মানেই বৈষম্যভিত্তিক রাষ্ট্র। মানুষের মৌলিক দ্বন্দ্ব ধর্মভিত্তিক নয়, মানুষের মৌলিক দ্বন্দ্ব শ্রেণিভিত্তিক। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ভেঙে সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন করতে পারলে বৈষম্যের চূড়ান্ত বিলোপের পথে খানিকটা অগ্রসর হতে পারব। এজন্যেই চৌ এন লাই ভাইরাসে আক্রান্ত হঠকারীগুলো ছাড়া সব বামপন্থীই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ১৫ অনুচ্ছেদ এবং এ সংক্রান্ত অন্য নীতিমালা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, এটি ছিল সেই লক্ষ্যের সীমিত অর্জন।

১৫ অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখেন। দরকার হলে বিস্তারিত পড়েন—কী বলছে সেখানে? বলা হচ্ছে, পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র নাগরিকদের ভাত, কাপড়, স্বাস্থ্য, কাজ নিশ্চিত করবে; সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; বেকার, পঙ্গু, বিধবা, এতিম, বৃদ্ধদের জন্যে সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করবে। নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এই নীতির ভিত্তিতে। আপনি এই বিধান ছুঁড়ে ফেলে কি অন্তর্ভুক্ত করবেন?

কড়াইল বস্তিতে আমি খবর নিয়েছি। ব্র্যাক, ইউনিসেফ এসে মানুষকে খাবার দিচ্ছে, নানা সাহায্য-সহযোগিতা করছে। ভালো কথা। কিন্তু আমার সংবিধান তো বলেছে, রাষ্ট্র আমাকে বিপদে সহযোগিতা করবে। সেটি গেল কই? ইউনিসেফ বা ব্র্যাক—ওদের অনেক টাকা, ওরা অনেক সাহায্য দিতে পারে। কিন্তু সেগুলো তো ভিক্ষা! মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া আমার সংবিধান যে সাহায্যের কথা বলছে, সেটি তো ভিক্ষা নয়, সেটি আমার রাষ্ট্রের সম্পদে আমার অধিকার।

মেহেরবানি করে একটু পড়ুন, ভাবুন। আপনি একজন বামপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। আপনি কেন বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চাইবেন? আপনি এটাকে আরও উন্নত ফরমেটে চাইতে পারেন, বলেন কী রকম করতে চান। এই সংবিধান তো তেল-গ্যাস-বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলে না। ১৫ অনুচ্ছেদ তো দেখালাম।

পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলছি আমরা। এটি তো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের প্রাপ্তি। কেন ছুঁড়ে ফেলবেন?

লেখক: আইনজীবী

* মতামত লেখকের নিজস্ব

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান
ইন্দোনেশিয়ায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে