বন্দর ইজারা, দুর্নীতি এবং...
প্রকাশ: ১৮:০৩, ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০২:৪৯, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
আরশাদ মাহমুদ
গত কয়েকদিন ধরে দেখছি ইউনূস সরকারের বিদেশিদের কাছে কয়েকটি বন্দর ইজারা দেওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্রমশ সন্দেহ এবং অস্বস্তি বাড়ায় সরকার থেকে এটার সুফল কী হবে সেটা বলা হচ্ছে। দিন দুয়েক আগে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান আশিক চৌধুরীর একটা পোস্ট পড়লাম। খুব সুন্দরভাবে তিনি সেখানে ব্যাখ্যা করেছেন যে এটা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা হচ্ছে এবং দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করা হয়নি।
তারপরও বিতর্ক থামছে না। আমি নিজে এ সম্পর্কে কয়েকবার লিখেছি এবং বিতর্ক কেন হচ্ছে সেটা উল্লেখ করেছি। এর প্রধান কারণ এটা নিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া; জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা এবং দেশের মূল সমস্যা যেমন, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা এগুলোর সুরাহা না করে বন্দর ইজারা দেওয়ার ব্যাপারে ইউনূস সাহেবের অতি আগ্রহ।
সরকার থেকে বলা হচ্ছে যে, নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের কারণে এই চুক্তিগুলো প্রকাশ করা সম্ভব না। তাড়াহুড়োর ব্যাপারে তাদের বক্তব্য হলো, যে সবসময় এখানে সময় ক্ষেপণের অভিযোগ করা হয়। এ কারণে তারা তাদের এফিশিয়েন্সি দেখানোর জন্য খুব দ্রুত এগুলো করেছেন। তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, কোনোভাবেই দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে না বরং লাভ হবে। খুব ভালো কথা। আমরা সবাই সেটা চাই।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৫ মাসের কার্যকলাপ দেখে জনমনে এদের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নানা ধরনের সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইউনূস সাহেব এবং তার কলিগদের কারণে-অকারণে বারবার বিদেশ যাওয়া নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কী, পৃথিবীর ইতিহাসে মনে হয় কোথাও নাই যে একজন সরকারপ্রধান ক্ষমতায় আসার ১৪ মাসের মধ্যে ১৪ বার বিদেশ সফরে গেছেন। এই সফরগুলোর অধিকাংশই ছিল তার ব্যক্তিগত; দ্বিপাক্ষিক নয়। সবচেয়ে বড় কথা বিদেশ ভ্রমণে অতিউৎসাহী হওয়ার কারণে এ সরকার দেশের মূল সমস্যাগুলোর কোনো দৃশ্যমান সমাধান করতে পারেনি।
এবার আসি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট এবং তড়িঘড়ি চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে। বারবার বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সেটাই তারা করেছেন। কিন্তু এ ধরনের অ্যাগ্রিমেন্ট দেশের ক্ষতির কারণও হতে পারে। আপনারা ইতোমধ্যে জানেন শেখ হাসিনার আমলে করা আদানির সঙ্গে চুক্তির কারণে আমাদের কী খেসারত দিতে হচ্ছে। ইউনূস সাহেব ক্ষমতায় আসার পর ভারতের বিরুদ্ধে অনেকটা যুদ্ধাংদেহী মনোভাব নিলেও, দিল্লির সঙ্গে করা এ পর্যন্ত একটি চুক্তিও বাতিল করেননি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি। এই দপ্তরের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান প্রকাশ্যে বলেছেন, চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। কারণ এটা করতে গেলে বাংলাদেশের অনেক বড় আর্থিক ক্ষতি হবে।
আগামী মাসে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের ইজারা নিয়েও একই অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে বলে আশঙ্কা করি। কয়েকদিন আগে দেখলাম ডিপি ওয়ার্ল্ড ইতিমধ্যে তাদের কাজের কারণে বিতর্কিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি আফ্রিকার ছোট্ট দেশ জিবুতির সঙ্গে তাদের নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির কারণে জিবুতির বর্তমান সরকার ওই চুক্তি বাতিল করেছে। এ নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করলে, রায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে যায়। আদালত জিবুতিকে প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়। জিবুতি বলেছে তারা এটা মানবে না। গত মাসে একটি আদালত জিবুতির পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এটা নিয়ে একটা জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরকম আরও কয়েকটা উদাহরণ আছে। আগ্রহী যে কেউ ইন্টারনেটে যেয়ে এ ব্যাপারে জানতে পারবেন।
আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই। সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন করাই আমার কাজ। এটাই করেছি বন্দর বিষয়ে আগের পোস্টগুলোতে। তার চেয়েও বড় কথা ইউনূস সরকারের গত ১৫ মাসের কার্যকলাপে তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে জনমনে নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আপনারা সবাই জানেন বন্দর ইজারা দেওয়া তাদের প্রায়োরিটির মধ্যে কখনোই ছিল না। হঠাৎ বিষয়টা সামনে আসে এই সরকারের আগ্রহের কারণে। মূল যে প্রায়োরিটিগুলো ছিল সেখানে তাদের কোনো তৎপরতা দেখতে পাইনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি ছিল আর্থিক খাতের অব্যবস্থা ঠিক করা; আইনশৃঙ্খলার উন্নতি; দুর্নীতি বন্ধ করা; আমলা নির্ভরতা কমানো; জননির্ভর হওয়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং চিহ্নিত ব্যবসায়ী নামের দুর্বৃত্তদের শাস্তি নিশ্চিত করা। একমাত্র আর্থিক খাতের কিছুটা উন্নতি ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন হয়নি। এই আর্থিক খাত নিয়েও এখন নানা দুর্নীতির খবর আসছে প্রতিনিয়ত। অন্যান্য সেক্টরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এরকম অবস্থায় আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটা নিয়েও জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে উচিত হবে জনগণকে না জানিয়ে বন্দর বিষয়ে সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করে কোন চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে না যাওয়া। মনে রাখতে হবে এটা অন্তর্বর্তী সরকার। এখানে যারা আছেন তারা কিছুদিন পর সবাই চলে যাবেন। সেক্ষেত্রে এই চুক্তির কারণে দেশের কোন বড় ক্ষতি হলে তাদের কাউকে পাওয়া যাবে না। আর এই ক্ষতির বোঝা বইতে হবে দেশের সাধারণ মানুষের।
তার চেয়েও বড় কথা বিদেশিদের কাছে পোর্টের ম্যানেজমেন্ট দিয়ে দিলে বাংলাদেশ থেকে কি দুর্নীতি উধাও হয়ে যাবে? দুর্নীতির প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে কর্মরত আমলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হচ্ছে। তাই মূল সমস্যার সমাধান না করে পেরিফেরিতে হাত দিলে, দেশের সার্বিক কোনো উন্নতি হবে না এটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
