দেশে চাই একটি কমিটেড শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দল
প্রকাশ: ১৭:২৬, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০২:২৮, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
আহসান হাবিব
ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিযুক্ত করাই হচ্ছে বিকাশের পক্ষে প্রগতিশীল পদক্ষেপ। এটা সমাজবিকাশের বৈশিষ্ট্য এবং পৃথিবীতে এই কাজ হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। ফরাসি বিপ্লব প্রথম পদক্ষেপ।
২. বাংলাদেশে সেই কাজটি হয় একাত্তরে। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করা হয়েছিল এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সকলের জানা, রাষ্ট্র সেই ধারা ধরে রাখতে সমর্থ হয়নি। নানা কূটকৌশল এবং চক্রান্তে তা ব্যর্থ হয়। এখান থেকে একটা সিদ্ধান্ত টানা যেতে পারে যে সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িক চেতনা নির্মূল করা যায়নি। এই ব্যর্থতা কার? এক কথায় প্রগতিশীলদের।
৩. বলশেভিক বিপ্লবের পর মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তোমরা তো আর চার্চে যেতে পারবে না! উত্তরে মানুষগুলি বলেছিল, ‘সমস্যা নাই, তার বদলে রুটি তো আছে’। অর্থাৎ আমাদের সবকিছুর মূলে একটাই মৌলিক চাহিদা ‘রুটি’। রুটি মিলেনি বলেই ধর্ম ফিরে ফিরে আসে। এই রুটি হরণ করে কে? এটাই আসল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরেই আছে রাষ্ট্র কেমন হবে তার চরিত্র।
৪. হরণ করে ব্যবস্থা। একসময় জমিদারি প্রথা ছিল, কৃষকরা ছিল শোষিত। তার মানে এখানে দুটো শ্রেণি, একটা শোষক, একটা শোষিত। এখন কে কার বিরুদ্ধে লড়াই করবে? কৃষক লড়াই করবে জমিদারের বিরুদ্ধে। জমিদার সংখ্যায় অল্প, তথাপি সব জমির মালিক তারাই, সব শস্যের মালিক তারাই। কৃষক পায় শুধু তার জীবন নির্বাহের জন্য যতটুকু ঠিক ততটুকু। শ্রমশোষণ ছিল আকাশচুম্বী।
শেরে বাংলা যে কৃষক প্রজা পার্টি তৈরি করেছিলেন, এটা ছিল সেই সময়ের জন্য একটি প্রগতিশীল ঘটনা। তিনি জমিদারি প্রথার উচ্ছেদে সংগ্রাম করেছেন। ফলে কৃষকরা তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি তিনি মুসলিম লীগ, যারা জমিদারি প্রথার পক্ষে ছিল, এর ডাকসাইটে নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনকে নির্বাচনে পরাজিত করেছিলেন। এই ইতিহাস সবাই জানে আশা করি।
কিন্তু এখান থেকে আমরা সামাজিক দ্বন্দ্বের যে বৈশিষ্ট্য পাই এবং তার ভিত্তিতে সঠিক রণকৌশল গ্রহণ করতে দেখি, তা পাই ফজলুল হকের মাঝে। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান গঠিত হলে জমিদারি প্রথা বাতিল হয়। কৃষকের জয় হয়। কিন্তু ক্ষমতা থাকে ধনিক মুসলিম লীগের হাতে যারা ছিল পাঁড় সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এখানে কৃষক যেমন সত্যিকার মুক্তি পায়নি, আবার রাষ্ট্রটি একটি সাম্প্রদায়িকতায় মোড়া, উপরন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের মতো একটি বিদেশি শক্তি। তাহলে দ্বন্দ্বটা কি দাঁড়াল? একদিকে কৃষকের পরাধীনতা, সঙ্গে রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক ও উপনিবেশিক চরিত্র। এর থেকে মুক্তির উপায়? জাতীয়তাবাদ এবং কৃষক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই এর সমাধান।
এই প্রেক্ষিতেই রাজনীতির মাঠে প্রবেশ করে আওয়ামী লীগ। প্রথমে মুসলিম শব্দটি ছিল, পরে ছেঁটে ফেলে সাচ্চা জাতীয়তাবাদী সংগঠনে রূপলাভ করে। শেখ মুজিব হচ্ছেন সেই নেতা যার নেতৃত্বে এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। শেরে বাংলার আন্দোলন ছিল জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নয়, জাতীয়তাবাদী চরিত্রেরও নয়। শেখ মুজিব এইসকল উভয় পশ্চাদপদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেন। ইতিহাস তাই এই দুজনের নাম অমোচ্য কালিতে লিখে দিয়েছে। কারণ, তারা সামাজিক দ্বন্দ্বকে শনাক্ত করেছিলেন যথাযথ এবং ছিল সঠিক কর্মসূচি ও রণকৌশল।
৫. কিন্তু স্বাধীনতার পর শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হলো পুঁজিবাদ। জাতীয়তাবাদ দিয়ে পুঁজিবাদকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। ধনি কৃষকরা ধীরে পুঁজিপতি হয়ে উঠল এবং পুঁজির চরিত্র অনুযায়ী মানুষ ভাগ হতে শুরু করল মালিক এবং মজুর এই দুই শ্রেণিতে। জমিদারি প্রথা থেকে কৃষক মুক্তি পেল কিন্তু কৃষকদের একটি ছোট অংশ যারা ছিল ধনি, তারাই শত্রু হয়ে দাঁড়াল। কারণ তখন তারা কৃষক এই অভিধা মুছে ফেলে নাম নিয়েছে পুঁজিপতি।
এখন এদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে কে? স্বভাবতই মজুর অর্থাৎ শ্রমিক বাহিনী। ইতিহাসে কখনো কখনো দেখা গেছে জাতীয়তাবাদী নেতা সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত করে ফেলে নিজেকে। ট্রু ন্যাশনালিস্ট হয়ে উঠতে পারে ট্রু সোশালিস্ট। শেখ মুজিব তাই হয়ে উঠেছিলেন, তিনি এই লক্ষ্যে কর্মসূচি দিয়েছিলেন বাকশালের। মাও সেতুং ছিলেন ট্রু ন্যাশনালিস্ট, পরে ট্রু কম্যুনিস্ট। সোশালিস্ট শেখ মুজিবের বাকশালই ছিল পুঁজিবাদবিরোধী কর্মসূচি।
এরপরের ইতিহাস সবাই জানে। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় পুঁজিবাদ এবং পশ্চাদপদ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাকে হত্যা করে। তাহলে পুঁজিবাদ থেকে শোষিত মানুষকে কে মুক্তি দেবে? দেবে প্রলেতারীয় শ্রমিক পার্টি। বাংলাদেশ এরকম একটি ট্রু প্রলেতারীয় পার্টি পায়নি। পায়নি বলেই রাষ্ট্রটি পুঁজিবাদ এবং তাদের দাস লুম্পেন বাহিনীর কব্জায় কুক্ষিগত হয়েছে। বাংলাদেশের বামপন্থার চরিত্র আগাপাছতলা পেটিবুর্জোয়া। ফলে তারা না পেরেছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, না পেরেছে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। বরং তারা এই দুই শক্তির অক্সিলিয়ারি শক্তি হিসেবে কাজ করে নিজেদের বিলুপ্ত বাস্তব করে তুলেছে।
এই মুহূর্তে সামাজিক দ্বন্দ্ব কী? একদিকে বৃহত্তর শোষিত শ্রেণি যার পুরোভাগে আছে শ্রমিক শ্রেণি, অন্যদিকে শোষক পুঁজিপতি শ্রেণি। এদের পক্ষে আছে অনুৎপাদনশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি, পেটিবুর্জোয়া লুম্পেন বাহিনী। তাহলে লড়াইটা হবে এই পুঁজিবাদী শক্তি ও শোষিত প্রলেতারীয় শ্রেণির মধ্যে। এখন চাই একটি কমিটেড শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দল। নেই বলে রাষ্ট্রটি একটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এরা শাপশাপান্ত করছে একে অপরকে, বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে নিজেদের মধ্যে। কারণ তাদের সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নাই। এই প্রতিপক্ষটিই হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি এবং তার পার্টি।
লেখক: ঔপন্যাসিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
