ব্যক্তিতাবাদী রাজনীতি বনাম ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি
প্রকাশ: ১১:৫৮, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৩:৩৬, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
আজিজুর রহমান আসাদ
বাংলাদেশের নানা সংকট, যেমন দারিদ্র্য, দুর্নীতি, বৈষম্য, অবিচার, সহিংসতা এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী বৈদেশিক নীতি; এইসব আর্থসামাজিক দুরবস্থা ও রাষ্ট্রীয় অপশাসনের জন্য আমরা সাধারণত ব্যক্তি সরকারপ্রধানদেরকে দায়ী করি। ইতিহাস চর্চায়, ব্যক্তিকে পূজনীয় অথবা নিন্দনীয় হিসেবে উপস্থাপন করি। দলের ক্ষেত্রে ‘নেতা বদলালেই সব ঠিক হয়ে যাবে’ ধরনের চিন্তা বেশ প্রবল। স্থানীয় ‘বাম’ নেতা পার্লামেন্টে নির্বাচন করতে পারলেই ‘জননেতা’ হয়ে উঠবে; ধরনের চিন্তাও ব্যক্তিতাবাদী, যেখানে শ্রমজীবীশ্রেণির সংগঠিত ক্ষমতা প্রধান নয়। লম্পট স্বামী ‘ঠিক হয়ে যাবে’ যদি বাচ্চার বাপ হয়ে যায়। মোল্লারা ‘ব্যক্তি মানুষের নৈতিকতা’ নিয়ে বিপুল উৎসাহী; গণহত্যাকারী শিশুধর্ষকেরাও ‘সৎ লোকের শাসন’ চায়। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি ‘দক্ষ ব্যক্তির’ হাতে দেওয়ার নামে সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী প্রাক্তন বামও, দেশটিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাইব্রিড উপনিবেশ হওয়াকে সমর্থন করে।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাগুলোর প্রাধান্য কেন? এর কারণ ‘সিস্টেম’ না বোঝা ও সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা। ব্যক্তির আচরণের মূলে আছে সে যে ব্যবস্থার মধ্যে বাস করে সেই ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক। ব্যক্তির আচরণ বা সক্ষমতা নির্ধারিত হয় সাধারণত বৃহত্তর সমাজ কাঠামো বা সিস্টেমের দ্বারা, সিস্টেমের প্রভাবে। স্থানীয় সিস্টেম আবার, জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার সাথে আন্তঃসম্পর্কিত। অর্থাৎ আমরা যদি শুধুই ব্যক্তিকে দায়ী করি, তাহলে সমাজের সমস্যাগুলো যে ব্যবস্থা থেকে জন্ম নেয়, সেই ব্যবস্থাকে অদৃশ্য রাখা হয় বা আড়াল করা হয়। বাংলাদেশের ক্রোনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আড়ালে করে, বাংলাদেশের ব্যক্তি আমলাদের ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি বোঝা যাবে না। ফলে ব্যক্তির আচরণ ও নৈতিকতা নিয়ে যতই চিৎকার করা হোক, দুর্নীতিমূলক ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটে না।
‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনীতির মূল প্রোপাগান্ডা কৌশলে ব্যক্তিকে দায়ী করা, অন্য কথায় সরকারপ্রধান বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে থাকা লোকটিকে লক্ষ্যবস্তু করা। কিন্তু যে কাঠামো ও ব্যবস্থা দুর্নীতি, দুঃশাসন ও সহিংসতার সমস্যা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে চলেছে, তা অক্ষত রাখে, টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, দুর্নীতির সুযোগ যেখানে ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিদ্যমান, সেই সমাজে একজন ব্যক্তি সৎ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই কাঠামো তাকে হয় গ্রাস করে নেবে অথবা সিস্টেম থেকে তাকে বাতিল করে দেবে। সুতরাং অপরাধ বা অন্যায় শুধু ‘ব্যক্তিগত’ নয়; বরং এটি ‘ব্যক্তির’ আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত সেই ব্যবস্থার ফল, যে ব্যবস্থা তাকে ওই আচরণে উৎসাহিত বা বাধ্য করেছে।
মানুষ অনেক সময়ই পরিস্থিতি, প্রণোদনা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মাইক্রো ব্যবস্থার চাপে এমন আচরণ করে, যা হয়তো তার ব্যক্তিগত নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়: কী ধরনের নিয়ম, পুরস্কার–শাস্তি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম আছে যা ব্যক্তি মানুষকে এমন আচরণ শেখায় ও বাধ্য করে। সমাজের সিস্টেম যখন মানুষকে অসৎ আচরণে উৎসাহিত করে, তখন ব্যক্তির নৈতিক গুণ ধরে রাখা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। এই কারণে ব্যক্তির চরিত্র বা নৈতিকতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে, সে যে সমাজে বাস করে সেই সমাজের কাঠামো ও ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অর্থাৎ ব্যক্তির আচরণের সামাজিক প্রেক্ষিত ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা দরকার।
ব্যক্তি কী বা কে? এই নিয়ে কার্ল মার্ক্সের একটি কথা আছে, ব্যক্তি মানুষ হচ্ছে, ‘ensemble of social relations’ অর্থাৎ ‘সামাজিক সম্পর্কের যোগফল’; ব্যক্তি ‘সামাজিক সত্ত্বা’। ব্যক্তির মানবিক সত্ত্বা, সমাজ নিরপেক্ষ কোন বিমূর্ত বা সহজাত গুণ নয়, বরঞ্চ ব্যক্তি হচ্ছে তার সামাজিক সম্পর্কের সামগ্রিকতা। এর মানে হচ্ছে, আমরা ব্যক্তি মানুষ ঐতিহাসিক ও সামাজিক, স্থান, কাল, সমাজ ভেদে আলাদা, বিশিষ্ট। আমাদের ব্যক্তি সত্ত্বা গড়ে উঠেছে একটি সুনির্দিষ্ট স্থান ও ঐতিহাসিক সামাজিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে। এখান থেকে মার্ক্সের সিদ্ধান্ত যে যদি আমরা মানুষ ও মানুষে মানুষে বৈষম্যের সম্পর্ক বদলাতে চাই, বদলাতে হবে তার প্রেক্ষিত ও ব্যবস্থাকে।
এর মানে আবার এই না যে, আমরা ব্যক্তি মানুষ যান্ত্রিকভাবে সমাজ ব্যবস্থার দাস। আমাদের কোন স্বাধীন সৃজনশীল চিন্তা তৈরি হতে পারে না। ব্যক্তির সাথে সমাজের বা ব্যবস্থার সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। সমাজব্যবস্থা যেমন আমাদের চিন্তা ও আচরণকে শেইপ দেয়, আমরাও তেমনি সমাজব্যবস্থা ও কাঠামোকে বদলাতে পারি। তবে এই বদল শুধু ‘ব্যক্তি’ বদলে সম্পূর্ণ হয় না, ব্যবস্থাকে বদলাতে হয়।
লেখক: গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
