মিডিয়াওয়াচ
দিল্লিতে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলের বৈঠক নিয়ে কিছু কথা
প্রকাশ: ১৯:৪৩, ২০ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৯:৫২, ২০ নভেম্বর ২০২৫
অজিত দোভাল ও খলিলুর রহমান
বুধবার সন্ধ্যা থেকে দেখছি, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে দেখা করেছেন তার বাংলাদেশ প্রতিপক্ষ খলিলুর রহমান। বাংলাদেশ এবং ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো ঘেঁটে দেখলাম সেখানে তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে কথা বলেছেন।
এই নিউজগুলো আমি যখন পড়ছিলাম বা টিভিতে দেখলাম বারবার আমার কাছে মনে হলো এ খবরগুলো সবই প্রেস রিলিজের ওপর ভিত্তি করে এবং এটাতে কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য নেই। সত্যি কথা বলতে কি আমি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে তেমন কোন কিছু আশা করি না। কারণ ন্যারেটিভ জার্নালিজম বা ইন্টারপ্রেটেটিভ জার্নালিজম বলতে যা বোঝায় সেটা এখানে অলমোস্ট নেই বললেই চলে। এদেশের সম্পাদক যারা তারাও মনে হয় এ ব্যাপারটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।

তবে কিছুটা বিস্মিত হয়েছি ইন্ডিয়ার নিউজগুলো পড়ে। যে তিনটি পত্র–পত্রিকার খবর দেখলাম সেগুলো হলো টাইমস অব ইন্ডিয়া; নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং ইন্ডিয়া টুডে। এ তিনটি খুবই উঁচু মানের পত্রিকা। তারাও দেখলাম খবরটা প্রকাশ করেছে প্রেস রিলিজের ওপর ভিত্তি করে যেটা হওয়ার কথা ছিল না। ইন্ডিয়ান নিউজগুলো দিয়েছে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস রিলিজের ওপর ভিত্তি করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশর সংবাদমাধ্যমগুলো একই কাজ করেছে।
প্রশ্ন হলো ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো এ খবর কেন ছাপলো তাদের সরকারের কোন অফিসিয়াল বক্তব্য ছাড়া? এর উত্তর হলো দিল্লি এই বৈঠক নিয়ে কোন অফিসিয়াল বিবৃতি দেয়নি। আর ইন্ডিয়ান জার্নালিস্টরাও তাদের কর্মকর্তাদের কোন ভার্সন বা বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেনি। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে দিল্লির কাছে এই বৈঠকটা ছিল খুবই গুরুত্বহীন। তার চেয়েও বড় কথা এই বৈঠকটা হয়েছিল বাংলাদেশের অনুরোধে। কারণ আপনারা জানেন যে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ নামে পাঁচ দেশের একটা আঞ্চলিক ফোরাম আছে যার সদস্য বাংলাদেশ। ভারত এবারের হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে অন্য চারটি দেশের মতো বাংলাদেশকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
বলাবহুল্য শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। গত ১৫ মাসে মন্ত্রীপর্যায়ের কোন উপদেষ্টা দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাননি। বেশ কয়েক মাস আগে জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ওখানে গিয়েছিলেন কোন একটা আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দিতে।
বলা বাহুল্য বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত খলিলুর রহমানও সেখানে গেছেন একটা বহুপক্ষীয় সম্মেলনে যোগ দিতে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে খলিল সাহেবকে একদিন আগেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য দিল্লিতে কেন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যেহেতু আমি কোন সরকারি ব্যক্তি নই, তাই তাকে কেন একদিন আগে যেতে হলো সেটা আমি বলতে পারি না। তবে দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় মনে করি যে শেখ হাসিনার বিচারের রায় এবং আবারও তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারটা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে সেটাকে আপাতত ধামাচাপা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। আর এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক যে অজিত দোভাল বা ভারতের কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না সেটা পরিষ্কার। কারণ দ্বিপাক্ষিকভাবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলে অজিত দোভাল তার জন্য অন্তত একটা লাঞ্চ বা ডিনারের ব্যবস্থা করতেন।
এবার আসি হাসিনার ফেরত যাওয়া প্রসঙ্গে। যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, তারপরও মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় হাসিনাকে তারা কোনোভাবেই ফেরত দেবে না। কেন দেবে না সেটা এর আগের লেখায় উল্লেখ করেছি।
আর এই চুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে বাংলাদেশের তথাকথিত বন্ধুরা অর্থাৎ আমেরিকা, চীন, রাশিয়া এরা কেউই বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে কনফ্রন্টেশনে যাবে না। কারণ আমরা স্বীকার করি বা না করি, ইন্ডিয়া এখন একটা বড় ইকোনমিক এবং মিলিটারি পাওয়ার। তার চেয়েও বড় কথা এটা একটা বিশাল বড় বাজার—১৪০ কোটি দেশের মানুষের। পৃথিবীর বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনগুলো সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। তাদের স্বার্থ হানি করে কোন দেশ বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে ভারতের সঙ্গে লড়তে যাবে না। এটাই বাস্তবতা।
মোদ্দা কথা হলো খলিল সাহেব বা তার বাবাকে পাঠালেও ভারতের বর্তমান পজিশনের কোন পরিবর্তন হবে না। লিখে নিতে পারেন।
পরিশেষে আমার সাংবাদিক বন্ধুদের একটাই অনুরোধ করব আপনারা অনুগ্রহ করে প্রেস রিলিজ ভিত্তিক খবর না করে, বিশ্লেষণধর্মী খবর লেখা বা প্রচার করার চেষ্টা করেন। আপনাদের বুঝতে হবে আপনারা সরকারি পত্র–পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের জন্য কাজ করেন না।
লেখক: সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
