চলে গেলেন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-লেখক দাউদ হোসেন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:৩৩, ২১ নভেম্বর ২০২৫
বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মার্কসবাদী লেখক ও তাত্ত্বিক দাউদ হোসেন আর নেই। ছবি: সমাজকাল
বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মার্কসবাদী লেখক ও তাত্ত্বিক দাউদ হোসেন আর নেই। সমাজ প্রগতি, শোষণমুক্তি, মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকারের সপক্ষে তিনি আজীবন নিবেদিত ছিলেন।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) দুপুরে ৮২ বছর বয়সে রাজধানীতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রয়াণে বাংলা ভাষায় মার্কসবাদী তত্ত্ব ও রাজনৈতিক দর্শনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকারক হারাল বাংলাদেশ।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছে এবং তার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা দাউদ হোসেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।
সিপিবি সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, দাউদ হোসেন মার্কসবাদী সাহিত্য রচনা ও অনুবাদে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। তার অনুদিত ‘রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ’ ও সম্পাদিত মার্কসের ‘পুঁজি’ গ্রন্থ বাংলাদেশের মার্কসবাদ চর্চায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সমাজ প্রগতি, শোষণমুক্তি, মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকারের সপক্ষে তিনি আজীবন নিবেদিত ছিলেন।
সিপিবি নেতারা বলেন, দাউদ হোসেন রাজনীতিবিদ পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক হিসেবে বিপ্লবী প্রজন্ম নির্মাণে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।
তার অনুদিত আমেরিকান আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাসের ভিত্তিতে ডি ব্রাউন রচিত গ্রন্থের অনুবাদ ‘আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে’ সংবেদনশীল পাঠকদের প্রিয় পাঠ্য।
জীবন, সংগ্রাম ও চিন্তার উত্তরাধিকার
দেশে মার্কসবাদী রাজনৈতিক চিন্তা, তাত্ত্বিক গবেষণা এবং সংগঠনমূলক কাজে বাংলাদেশের বাম ধারায় যে ক’জন ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন ধরে নিবিড় ও নীরব শ্রম দিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে দাউদ হোসেন অন্যতম। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, অনুবাদক ও তাত্ত্বিক।
বাংলাদেশের বামরাজনীতির সংগঠন—বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাউদ হোসেনের ভূমিকা দেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শৈশব, শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ
দাউদ হোসেন ১৯৪০ এর দশকে জন্মগ্রহণ করেন। সামন্তশোষণ, শ্রেণিবৈষম্য ও শাসকগোষ্ঠীর দমনপীড়নের বাস্তবতা কৈশোরেই তার রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করে। ছাত্রজীবনেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতি ও মার্কসবাদী দর্শনের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় তিনি শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক সংগ্রাম ও বাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের গভীর পাঠক ও চর্চাকারী হয়ে ওঠেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ
১৯৭১ সালে দেশ যখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছে, তখন দাউদ হোসেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় তার রাজনৈতিক ভাবনা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করে।
বামরাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা
স্বাধীনতার পর তিনি বিভিন্ন বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে চিন্তা–তত্ত্ব–রাজনীতিকে একই স্রোতে প্রবাহিত করেন। বাংলাদেশে বাম আন্দোলন যখন নানা মতাদর্শিক বিভাজন ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগছিল, তখন দাউদ হোসেন তাত্ত্বিক স্পষ্টতা ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেন।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের সাধারণ সম্পাদক হন এবং দীর্ঘসময় ধরে সংগঠনকে তাত্ত্বিকভাবে সুদৃঢ় করতে কাজ করেন।
মার্কসবাদী রচনায় অবদান
দাউদ হোসেনের অন্যতম বড় অবদান তাঁর অনুবাদ ও সম্পাদনা-নির্ভর কাজ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
‘রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ’— এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির অনুবাদ। এই অনুবাদ লেনিনের তাত্ত্বিক কাজকে বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।
কার্ল মার্কসের “Capital / পুঁজি” গ্রন্থের সম্পাদনায় সক্রিয় ভূমিকা। এই সম্পাদনায় তিনি ধারণাগত সুস্পষ্টতা, পরিভাষা নির্বাচন ও তাত্ত্বিক গঠনকে অত্যন্ত যত্নে উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশে মার্কসবাদী অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে আগ্রহী গবেষক, ছাত্র ও কর্মীদের কাছে তার কাজ মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
জীবনজুড়ে তাত্ত্বিক চর্চা
দাউদ হোসেনের লেখালেখি ও বক্তব্যের মুল প্রণিধান ছিল- পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিশ্লেষণ, কৃষি–শ্রমিক শ্রেণির প্রশ্ন, রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, বিপ্লবী দল গঠনের সংগঠন–শৃঙ্খলা।
দাউদ হোসেন বিশ্বাস করতেন—রাজনীতি শুধু মাঠের লড়াই নয়; তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ছাড়া বিপ্লবী শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
মানুষ হিসেবে দাউদ হোসেন
তিনি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সংযত, বিতর্কে না গিয়ে স্পষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করতেন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা, নোট তৈরি এবং তরুণ কর্মীদের তাত্ত্বিক পাঠদানে সময় দিতেন।
উত্তরাধিকার
দাউদ হোসেনের কাজ আজ শুধু বামরাজনীতির দলিল নয়—বাংলাদেশে শ্রেণিবৈষম্য, রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও পুঁজিবাদের গতিশীলতা বুঝতে আগ্রহী গবেষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তার লক্ষ্য ছিল একটি শোষণমুক্ত, মানবিক সমাজ—যেখানে সাম্যের আদর্শ বাস্তবে রূপ পাবে। তাত্ত্বিক কঠোরতা, রাজনৈতিক সততা ও সংগ্রামী জীবনের এই উত্তরাধিকারই তার প্রকৃত পরিচয়।
