শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

বেতিয়ারা যুদ্ধের ৯ বীর: শহীদ আজাদ থেকে দুদু মিয়া

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৮:৫০, ১১ নভেম্বর ২০২৫

বেতিয়ারা যুদ্ধের ৯ বীর: শহীদ আজাদ থেকে দুদু মিয়া

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা রণাঙ্গণের মৃত্যুঞ্জয়ী ৯ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে আছে বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর অপার মমতার ছোঁয়া। সেই ইতিহাসেরই এক রক্তাক্ত অথচ গৌরবোজ্জ্বল পর্ব — কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের জুন মাসে নয়জন তরুণ মুক্তিকামী যোদ্ধা বিশেষ গেরিলা বাহিনীর অগ্রগামী দল হিসেবে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করেছিলেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। তাদের লক্ষ্য—মুক্তির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করা, দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: বেতিয়ারায় পাক সেনাদের ওঁৎপেতে থাকা ঘেরাটোপে তারা পড়ে যান।

একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে কিশোর ও তরুণ গেরিলাদের সীমিত গোলাবারুদ। তবুও তাঁরা পিছু হটেননি। শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধে তারা বুক উজাড় করে লড়েছিলেন, যেন বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

সেদিন বেতিয়ারার মাঠে মিশে গিয়েছিল নয়টি তরুণ প্রাণ, কিন্তু তারা রেখে গেছেন চিরজাগ্রত এক নাম— বাংলার বেতিয়ারা নয় শহীদ।

শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ — ছাত্রনেতা থেকে গেরিলা কমান্ডার

বাংলাদেশের প্রখ্যাত কূটনীতিক ও লেখক কামরুদ্দীন আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র আজাদ জন্ম নেন ১৪ আগস্ট ১৯৪৮ সালে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা আজাদ ছিলেন মেধাবী ও আধুনিকচেতা তরুণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রাবস্থায়ই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। স্কাউট, বিতার্কিক ও সংগঠক এই তরুণ ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য এগিয়ে আসেন।

ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে আজাদ নেতৃত্ব দেন বেতিয়ারার অগ্রগামী ইউনিটে।
পাক সেনাদের ‘হ্যান্ডস আপ’ নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি লড়াই চালিয়ে যান। সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে গিয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়েন। এরপর আর কেউ তাঁর খোঁজ পায়নি।

তার এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে ঢাকা কলেজে স্থাপিত হয়েছে “শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ স্মৃতিফলক”।

শহীদ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর — সাহিত্যপ্রেমী বিপ্লবী

পুলিশ কর্মকর্তা দলিলউদ্দিন আহমদের জ্যেষ্ঠ পুত্র সিরাজুম মুনীর ছিলেন মেধাবী, সাহিত্যানুরাগী ও চিন্তাশীল তরুণ।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’-এ ‘দুইয়ে দুইয়ে এক’ নামে জনপ্রিয় রাজনৈতিক কলাম লিখতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে তিনি ছাত্র রাজনীতিকে সচেতনতার নতুন মাত্রা দেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে। তাঁর সাহিত্যিক মন ও সংগ্রামী চেতনা একাকার হয়ে যায় অস্ত্র হাতে নেওয়া এক যোদ্ধায়।

বেতিয়ারার সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণার প্রতীক।

শহীদ মো. বশিরুল ইসলাম (বশির মাস্টার) — গ্রামের শিক্ষক, জাতির সৈনিক

রায়পুরার কান্দাপাড়ার সন্তান বশিরুল ইসলাম ছিলেন সৎ, বিনয়ী ও দৃঢ়চেতা যুবক। ঢাকা ল’ কলেজের ছাত্র হলেও তিনি বিনাবেতনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন বলে ছাত্রদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘বশির মাস্টার’ নামে।রাজনীতিতে সচেতন ও ক্রীড়ামোদী এই তরুণ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
বেতিয়ারার যুদ্ধে আহত অবস্থায় পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন।
তার নামেই রায়পুরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘শহীদ বশিরুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

 শহীদ জহিরুল হক ভুঁঞা (দুদু মিয়া) — মাটির মানুষ, মেরুদণ্ডের প্রতীক
অল্প বয়সেই পিতা হারানো দুদু মিয়া ছোটবেলায়ই সংসারের দায়িত্ব নেয়। দিনমজুর হলেও ছিল তার অদম্য দেশপ্রেম।
বেতিয়ারার যুদ্ধে গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও শেষ নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করেন, “জয় বাংলা।”
গোলাগুলির মাঝেই তার রক্তে ভিজে যায় ভূমি—কিন্তু তার কণ্ঠ থামে না।
তার এই আত্মবলিদান আজও রায়পুরার মানুষের মুখে মুখে।

 শহীদ আওলাদ হোসেন — গান গেয়ে যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন

নারায়ণগঞ্জের আওলাদ হোসেন ছিলেন ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক, নজরুলসঙ্গীতশিল্পী ও সংগ্রামী তরুণ।চাকরি পাওয়ার পরও তিনি মাতৃভূমির টানে যুদ্ধে যান।

যুদ্ধের আগে মা’কে লেখা তার শেষ চিরকুটে লেখা ছিল—
“আমি যুদ্ধে যাচ্ছি, ফিরে না এলেও জানবেন, আপনার ছেলে দেশের জন্য গিয়েছে।”
বেতিয়ারার যুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে শহীদ হন।
তার স্মৃতিতে বন্দরে নির্মিত হয়েছে সমাধি এবং স্থানীয় স্কুলে এখনো বাজে তার প্রিয় গান—
“যেদিন রবো না তোমাদের মাঝে, গেয়ো শুধু মোর গান...”

শহীদ শহীদুল্লাহ সাউদ — ১৪ বছরের খেলাঘরের কিশোর যোদ্ধা

নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের নবম শ্রেণির ছাত্র শহীদুল্লাহ সাউদ খেলাঘর আসরের এক কিশোর সদস্য।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে দেশের টানে সীমান্ত অতিক্রম করে যুদ্ধে যোগ দেন।
বেতিয়ারার যুদ্ধে পাক সেনারা তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
তার সহযোদ্ধা শুক্কর মাহমুদ পরে বলেন, “সাউদ রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়েও ‘জয় বাংলা’ বলেছিল।”
তার স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘শহীদ শহীদুল্লাহ সাউদ স্মৃতি সংসদ’।

শহীদ আব্দুল কাইউম — বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থেকে জনযোদ্ধা

চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমলের সন্তান আব্দুল কাইউম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র।
ন্যাপ নেতা ও সংগঠক হিসেবে তিনি মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করেন।
বেতিয়ারার যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিয়ে নিজে জীবন উৎসর্গ করেন।
তার ছাত্ররা পরে গড়ে তোলেন ‘শহীদ আব্দুল কাইউম স্মৃতি পাঠাগার’।

 শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ — নোয়াখালীর কিশোর বীর

বেগমগঞ্জের আলাইরপুর গ্রামের শান্ত স্বভাবের এই কিশোর যখন দশম শ্রেণির ছাত্র, তখনই যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বেতিয়ারার যুদ্ধে অংশ নিয়ে অসীম সাহসিকতায় লড়াই করেন।
শত্রুর বেয়নেট আঘাতে শহীদ হন, কিন্তু তার নাম আজও বেঁচে আছে ‘শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ স্মৃতি পাঠাগার’-এর দেয়ালে দেয়ালে।

শহীদ আব্দুল কাদের — সাধারণ কৃষক থেকে কিংবদন্তি যোদ্ধা

চৌদ্দগ্রামের সাতবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের ছিলেন গেরিলা যোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক।
ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে আনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
বেতিয়ারার যুদ্ধে সম্মুখসমরে পাক সেনাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে শহীদ হন।
তাঁর সমাধি আজও গুণবতী গ্রামের মানুষের গর্বের স্থান।

বেতিয়ারা যুদ্ধ : আত্মত্যাগের স্মারক

চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা স্মৃতিসৌধ আজ জাতির সংগ্রামী আত্মার প্রতীক।
যেখানে প্রতিটি ইট ও শিলায় লেখা আছে নয় বীরের ত্যাগের ইতিহাস।
তাঁদের নাম শুধু পাথরে খোদাই নয়, প্রজন্মের হৃদয়ে খোদিত হয়ে আছে।
যে তরুণেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলার, তাঁদের রক্তেই লেখা হয়েছিল এই দেশের মানচিত্র।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান
ইন্দোনেশিয়ায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে