শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবিস্মৃত-অনালোকিত অধ্যায় ‘বেতিয়ারা’

হাবীব ইমন

প্রকাশ: ১৮:২৩, ১১ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৯:১৪, ১১ নভেম্বর ২০২৫

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবিস্মৃত-অনালোকিত অধ্যায় ‘বেতিয়ারা’

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা সমাথিক্ষেত্র ও স্মৃতিসৌধ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলােেশর স্বাধীনতা কারোর দান নয়—এটি ছিনিয়ে আনা এক রক্তাক্ত ইতিহাস। প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে এই শ্যামল দেশের সবুজ অঙ্গনে হয়েছিল এক ‘দুনিয়া কাঁপানো যুদ্ধ’। অন্যায় আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবারে আগুনে লাখো যৌবন জ্বলে উঠেছিল এক অখন্ড অঙ্গারের মতো। সেই আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। যেখানে কুড়ানো আগুনের শিখা জ্বলেছে, সেখানেই জন্ম নিয়েছে স্বাধীনতার তপ্ত বীজ, সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য অজানা গল্পেরও সূচনা হয়েছে। এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের দিতে হয়েছে অসীম মূল্য—৩০ লাখ শহীরে আত্মদান, ২ লাখ মা-বোনের ত্যাগ ও লাঞ্ছনা, কোটি কোটি মানুষের আত্মনিবেদন ও সংগ্রাম অতিক্রম করেই আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক সত্যিকারের জনযুদ্ধ—যেখানে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, কবি, কর্মচারী, বুদ্ধিজীবী—সবাই মিলে অংশ নিয়েছিলেন স্বেেশর মুক্তিতে।

স্বাধিকার আন্দোলনে যেমন অংশ নিয়েছিল সাধারণ মানুষ, তেমনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিকামী নেতাকর্মীরাও। তারা শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামে নয়, সরাসরি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন মুক্তির লড়াইয়ে। এ লেখায় তুলে ধরা হচ্ছে তাদেরই এক বীরত্বগাথা—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘বেতিয়ারা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত সেই অবিস্মৃত অথচ অনালোকিত অধ্যায়।

১৯৭১ সালের ভয়াল দিনে মুক্তিযোদ্ধারে একটি গেরিলা দল প্রশিক্ষণ শেষে বাংলােেশ প্রবেশের সময় কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বেতিয়ারা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যাম্বুশে পড়ে। সেখানে সংঘটিত হয় এক তীব্র সংঘর্ষ। অসম যুদ্ধেও বীর মুক্তিযোদ্ধারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়েছিলেন মাতৃভ‚মির স্বাধীনতার জন্য। সেদিন নয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন—যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বেতিয়ারা অঞ্চল; ইতিহাসে যুক্ত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়—অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের।

মে মাসে বাংলাশে লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) নামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী গঠিত হয়, যা পরে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিত হয়। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি চেষ্টা করে ন্যাপ-কমিউনিস্ট-ছাত্র ইউনিয়নের একটি যৌথ গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার। মে মাসের শেষেিক এক-দেড় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বাহিনী গঠনের কাজ শুরু হয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় তেজপুর থেকে কিছুটা দূরে সেলোনবাড়ি নামে একটি স্থানে গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়; পাশাপাশি নেফা এলাকায় ডেমিলেশনসহ উন্নত যুদ্ধকৌশলের প্রশিক্ষণও নেওয়া হতো। প্রশিক্ষণ শেষে পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরায় গেরিলাদের জন্য বাইখোরাক বেইস ক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে আরও ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে ইয়ু ক্যাম্প স্থাপন করে হাজার হাজার যুবকের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণ চালানো হতো; সেখান থেকে বাছাই করে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য তেজপুর পাঠানো হতো।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বাম দলগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দিক থেকে কিছুটা দ্বিধা ছিল—যুদ্ধের নেতৃত্ব যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে দিকটি বেশি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছিল। ভারতের কংগ্রেসও সংশয় প্রকাশ করেছিল; বিশেষত সিপিএম-এর সঙ্গে তখন কংগ্রেসের রাজনৈতিক সম্পর্ক এতটা মসৃণ ছিল না। তবুও বামপন্থীরা পাহাড়ে বসে থাকেনি; বরদলুই ক্যাম্পে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

বলাই বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাংলােেশর বাম দলগুলোর প্রতি আওয়ামী লীগ সরকার এবং ভারত কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। যুদ্ধের নেতৃত্ব যাতে বেহাত না হয় সেেিক আওয়ামী লীগ ছিল খুব সচেষ্ট। দলটির দক্ষিণপন্থী অংশ তখন বামপন্থীদর মুক্তিযুদ্ধে নিতে চাচ্ছিল না। ভারতের কংগ্রেসও নারাজ ছিল; বিশেষ করে সিপিএমের সঙ্গে সেখানে তখন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। ভারতীয়রা তাই বামপন্থীদের কোনো অস্ত্র দিচ্ছিল না। তবে বসে না থেকে বামপন্থীরা সেখানকার বরদলুই ক্যাম্পে কার্যক্রম চালিয়ে যান। 

এক পর্যায়ে যখন বাংলােেশর ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা কমে যায় তখন মস্কো ও সিপিআইর সহযোগিতায় মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহম, বারীণ দত্ত, খোকা রায় ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী সম্মত হন তাদের সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়ার। তবে এটা ছিল খুব গোপন একটা তৎপরতা—বাংলাদেশ সরকারও জানত না বিষয়টা। ভারত বাংলােেশর বামপন্থী দলগুলোকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করল। সবাই দলে দলে ভারতের আগরতলায় পৌঁছাতে শুরু করলেন।

আগরতলায় বাম লগুলোর নেতাকর্মীরা ‘ক্র্যাফস হোস্টেলে’ থাকতেন। এটা ছিল প্রাথমিক ক্যাম্প। সেটি পরিচালনা করতেন জ্ঞান চক্রবর্তী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য এবং মতিয়া চৌধুরী। এ ছাড়া এখান থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য সক্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কমরেড মণি সিংহ, মোজাফফর আহম, মোহাম্মদ ফরহাদ, অনিল মুখার্জি, মতিউর রহমান, শেখর দত্ত, আবদুল হাদী প্রমুখ। নারী নেত্রী বেগম মুশতারী শফি ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মোহাম্ম বেলালও এই হোস্টেলে কিছুদিন ছিলেন। রিক্রটিংয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক। এরপর রিক্রুটিং সেন্টার হিসেবে আগরতলার আগরতলার বড়য়োলি ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। তখন এই ক্যাম্পের লিডার ছিলেন মনজুরুল আহসান খান, এ ছাড়া ডেপুটি লিডার ইয়াফেস ওসমান ও চট্টগ্রামের শাহ আলম আর টিম লিডার ছিলেন নিজাম উদ্দিন আজা।

বাংলাদেশ থেকে পৌঁছানো কর্মীরা এই কেন্দ্রে আশ্রয় পেতেন। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর তাদের মৌলিক প্রশিক্ষণ ছিলো বাধ্যতামূলক। এরপর তাদের মধ্য থেকে গেরিলা যুদ্ধের জন্য যোদ্ধা বাছাই করা হতো। পরবর্তী ধাপে তাদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য আসামের তেজপুর ক্যাম্পে পাঠানো হতো। প্রশিক্ষণ শেষে তারা আবার এই ক্যাম্পে ফিরে আসতেন এবং এখান থেকেই দেশের ভেতর তাওে ইনডাকাশনের (দেশ ফেরত) ব্যবস্থা করা হতো। গেরিলা বাহিনীর অপারেশন প্ল্যানিং কমিটির (ওপিসি) সদস্য হিসেবে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এই ইনডাকশন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। 

প্রশিক্ষণ শেষে শে মাতৃকাকে হানামুক্ত করার জন্য ছোট ছোট গেরিলা দলে বিভক্ত হয়ে তারা দেশে প্রবেশ করা শুরু করে। গেরিলা যুদ্ধের নিয়মানুযায়ী, সাধারণ কৃষক বা পথচারীর ছদ্মবেশে অস্ত্রপাতি ও সমর-সরঞ্জাম নিজের নাগালের মধ্যে লুকিয়ে রেখে সীমান্ত অতিক্রম করে অপারেশন এলাকায় তারে পাঠানো হতো। সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ইনডাকশনের পালা শুরু হয়। গেরিলা দলগুলো তাদের জন্য নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে প্রথমে জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে ক্রমান্বয়ে অপারেশন শুরু করে দেয়। এ ধারাবাহিকতায় প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ইনডাকশনে আসা নয়জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বেতিয়ারা এলাকায় শহীদ হন। তবে বেতিয়ারা ঘটনার ক্ষেত্রে ইনডাকশন পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটায়—কয়েকজনকে ওপেন অস্ত্রসহ এবং অন্যরেকে ছালাপ্যাক করা অস্ত্র সহ পাঠানো হয়েছিল, যা ওই পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা ও ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

১০ নভেম্বর ১৯৭১

আগরতলার অদূরে মুক্তিযোদ্ধারে বেইস ক্যাম্পে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। প্রত্যেকটি তাঁবুতে আলো জ্বালানো হয়েছে। তাঁবুর ভেতরের আলো ঠিকরে বের হয়ে অন্ধকার হঠানোর চেষ্টা করছে। পুরো ক্যাম্প জুড়েই আজ একটা সাজ সাজ রব বিরাজমান। আসামের তেজপুর থেকে উচ্চতর ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা মুখিয়ে আছেন কখন বাংলােেশ প্রবেশ করবেন। টিম লিডার ইয়াফেস ওসমান ঘন ঘন এদিক-সেদিক পায়চারী করছেন। উত্তেজনার বারুদ তখন তুঙ্গে। পরদিন সকালে ইনডাকশন হবে, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর লটি সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার জন্য অস্থির হয়ে আছে। দলটির সামগ্রিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তৎকালীন বুয়েটের ভিপি ও প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের পুত্র স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে (সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী)। ডেপুটি কমান্ডার নিয়োগ করা হলো তৎকালীন ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের ছাত্রনেতা নিজাম উদ্দিন আজাদকে।

১১ নভেম্বর ১৯৭১
দুপুরের খাবার খেয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে গেরিলারা রওনা দিলেন সীমান্তের দিকে। সন্ধ্যার দিকে সীমান্তের খুব কাছাকাছি এসে জঙ্গলের ভেতর সাময়িক অবস্থান নিলেন তারা। কিছুক্ষণ পর মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের শেষ সীমান্ত ভৈরব টিলায় এসে অবস্থান নিলেন; এটি বাংলােেশর সীমান্ত গ্রাম বেতিয়ারার খুব নিকটেই অবস্থিত। এখানে অবস্থান নিয়ে টিম লিডার ইয়াফেস ওসমান প্রফেশনাল গাইডকে পাঠালেন রেকি করতে। ভৈরব টিলা থেকে নেমেই বেতিয়ারা গ্রাম। সেই গ্রাম ভে করে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের একপাশে জগন্নাথ দীঘি আর অন্যপাশে শর্শাি নামক স্থান। পাকিস্তান বাহিনী এই  একই স্থানেই  ঘাঁটি গেড়ে আছে।  রাতের বেলা দুটো ঘাঁটি থেকে হানাদার বাহিনী জিপযোগে টহল দিয়ে থাকে। দুই টহল দলের মাঝে ৪৫ মিনিট সময় পাওয়া যায়। এই সুযোগেই গেরিলাদের মহাসড়ক পার হতে হবে।
গেরিলারে লক্ষ্য হলো গুণবতী-নোয়াখালী ও চাঁদপুর হয়ে ঢাকায় পৌঁছানো। ইতোমধ্যে রেকি টিম থেকে খবর চলে এলো মহাসড়ক ফাঁকা, টহল টিমের অস্তিত্ব নেই; তৎক্ষণাৎ ইয়াফেস ওসমান ভৈরব টিলা থেকে গেরিলাদের মুভ করার সবুজ সংকেত দিলেন। সতর্কতা হিসেবে দুটি অ্যাসল্ট পার্টি মোতায়েন করা হলো যেন আঘাত আসলে প্রত্যুত্তর দেয়া যায়। ভৈরবটিলা থেকে নেমে মুক্তিযোদ্ধারা সমতলের ক্ষেত-খামারের আইলের পথ ধরে এগোতে থাকে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে সিঙ্গেল ফাইলে এগিয়ে যেতে থাকে গেরিলা দল। সবচেয়ে সামনে লোডেড স্টেনগান নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ডেপুটি লিডার নিজাম উদ্দিন আজা। তার পরপরই অস্ত্র রেডি পজিশন নিয়ে কয়েকজন যোদ্ধা তাকে অনুসরণ করছে। তারে পেছনে প্যাকিং করে অস্ত্রের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাকি যোদ্ধারা সন্তর্পনে এগিয়ে চলেছেন। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে তখন নিজ মাতৃভ‚মি হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

হাই কমান্ড ৭৮ জনের এই গেরিলা দলকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে। গ্রুপ আকারে এই গেরিলা দলগুলো হলো— ১. কৃষক গেরিলা গ্রুপ, ২. শ্রমিক গেরিলা গ্রুপ, ও ৩. ছাত্র গেরিলা গ্রুপ—সবগুলো গ্রুপই সম্মিলিতভাবে ঢাকায় অপারেশন চালাবে।

কৃষক গেরিলা গ্রুপের লিডার নিজাম উদ্দিন আজাদ আবার পুরো টিমের ডেপুটি লিডার। তার নেতৃত্বে অগ্রগামী লের সম্মুখে আছে এক স্কাউট বাহিনী। নিজাম উদ্দিন আজা সিভিলিয়ান গাইডকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলছেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলােেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার বেতিয়ারা গ্রামের পাশ দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিঅ্যান্ডবি রোড পার হয়ে যাবে গেরিলারা—এটাই ছিল পরিকল্পনা। প্রফেশনাল গাইড ও রেকি টিমের ভাষ্য অনুসারে, তখন মহাসড়ক নির্বিঘ্ন থাকার কথা। অন্ধকারের জন্য সামনের পথ খো যায় না এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলছে গেরিলারে দলটি। সতর্কতাস্বরূপ দলের চৌকস ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে মহাসড়কের পূর্ব পাশে দুটি অ্যাসল্ট পার্টিতে বিভক্ত করা হলো। দুটি পার্টি ডানদিক ও বামেিক কভার করবে। মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে গিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেবে। ডানদিকের বাহিনী ডানদিকের টহল জিপের আক্রমণ ঠেকাবে; বামদিকের বাহিনী ঠেকাবে বামদিকের আক্রমণ।

গেরিলারা গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে পায়ে পা টিপে এগিয়ে যাচ্ছিল। বাঁশঝাড় ও গাছ-গাছালিতে ভরপুর গ্রামের ভেতরটা মনে হচ্ছে রাতের অন্ধকার গিলে খাবে। জোনাকিরা আলো জ্বেলে পথ দেথিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের। প্রায় মূল রাস্তার কাছে চলে এসেছে মুক্তিযোদ্ধারা। আর মাত্র ২০ গজের মতো বাকি। অূরে একটি কালভার্ট। এটা পার হলেই পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা পার হলেই গ্রামের পথ ধরে পূর্ব নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া যাবে।

মুক্তিযোদ্ধা লটির সম্মুখে দুজন সিভিলিয়ান গাইড পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে কমরেড নিজাম উদ্দিন আজা এবং তার পেছনে বিশাল গেরিলা বাহিনী চোখ-কান খোলা রেখে এগিয়ে চলছে। গাইড দুজন গ্রামের পথ দেখিয়ে নির্ধারিত স্থানে নিরাপে নিয়ে যাবে। যখনই গেরিলাদের সামনের দুজন কালভার্টের ওপর পা রাখলো, তখনই গর্জে উঠলো হানাদার বাহিনীর অস্ত্র। অ্যাম্বুশ বাহিনী ‘হল্ট’ বলে চিৎকার দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে পুরো দলের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। সর্বনাশ! পাকবাহিনী তাদের ইনডাকশনের আগাম খবর যেয়ে গেছে!

সামনে থাকা কমরেড আজাদ সঙ্গে সঙ্গে তার স্টেনগান থেকে পাল্টা ফায়ার ওপেন করলেন। তার স্টেনগান গর্জে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে খোলা অস্ত্র বহনকারী অন্য গেরিলারাও ফায়ারিং শুরু করে দিল। বিভ্রান্ত হয়ে গেল দুই দিকে মুখ করা দুটি অ্যাসল্ট বাহিনীর সদস্যরা। উপায় না দেখে যোদ্ধারা বুদ্ধি করে গুলির উৎসের দিকে এলএমজির ব্রাশফায়ার শুরু করে দিল। গেরিলারা অন্ধকারের মধ্যে ক্ষেতের আইলের পেছনে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। পাক হানাদার বাহিনীর দূরে জগন্নাথ দীঘি এলাকা থেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর উপর্যুপরি হামলা করতে থাকে। প্রচন্ডভাবে গুলি আসতে থাকে তিন দিক থেকে। এই অবস্থায় কোনো রকমে ‘রিট্রিট’ বলে চিৎকার দিয়ে সবাইকে ক্রল করে পেছনে ফিরে আসতে বলা হলো। পেছনের সহযোদ্ধা, কমরেড, সাথীরা যেন নিরাপদে পিছু হটতে পারে সেজন্য সম্মুখের অস্ত্র বহনকারীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গুলি চালিয়ে যেতে লাগল। বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ছিল ‘হিট অ্যান্ড রান’ অর্থাৎ ‘হামলা কর এবং শটকে পড়’। গেরিলা বাহিনীর পক্ষ থেকেই শত্রুর ওপর অ্যাম্বুশ করা দরকার। কিন্তু গেরিলারাই অ্যাম্বুশের মুখোমুখি হন।  

সবার সামনে অবস্থান নেওয়া নিজাম উদ্দিনের স্টেনগান একসময় থেমে যায়। পাকিস্তানি মিলিটারি নিজাম উদ্দিনকে ধরে ফেলে। হানাদার অফিসারদের সঙ্গে নিজাম উদ্দিনের ইংরেজিতে তর্ক-বিতর্ক হয় এবং পাকসেনারা তাকে হত্যা করে। শত্রুর প্রচন্ড আঘাতের পরও পেছনের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা ক্রলিং করে প্রাণ নিয়ে পিছু হটতে সক্ষম হয়। এরকম অ্যাম্বুশে দলের প্রায় সকলেরই প্রাণ হারানোর কথা। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলে সেদিন। 

গোলাগুলি একপর্যায়ে থেমে যাওয়ার পর পাকবাহিনী পাশের ধানক্ষেতে অবস্থান নেয়। টর্চ লাইট জ্বালিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করে আনে যুদ্ধাহত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তারে। সেদিন বেতিয়ারার ঘটনাস্থলেই ছয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহী হন, এবং তিনজনকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাকিস্তানি আর্মির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জানা যায়নি।

বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো

১১ নভেম্বর ১৯৭১ বেতিয়ারায় পাক-হানাদার বাহিনীর অ্যাম্বুশের পর বাংলাশে-ভারত সীমান্তের এপার-ওপার প্রচন্ড শেলিং শুরু হয়। উভয়পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে জীবিত ও আহত যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকেন। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা একে একে ফিরে আসতে থাকেন তাদের সীমান্তের মিটিং পয়েন্টে। একজন গেরিলাও তার অস্ত্র ফেলে আসেননি। প্রত্যেকেই বিধ্বস্ত, কিন্তু মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় অমিত তেজে দীপ্ত। এ ধরনের ঘটনায় দল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রচুর ঘটে থাকে। কিন্তু বেতিয়ারায় এমন ঘটনা ঘটেনি। অপরিচিত ও প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে আচমকা হামলার মুখেও কীভাবে এত সংখ্যক গেরিলা যোদ্ধা আত্মরক্ষা করতে পেরেছিলেন এবং কীভাবে মিটিং পয়েন্টে ফিরে আসতে পেরেছিলেন, তা ছিল সত্যিই এক বিস্ময়। পরবর্তীতে কয়েক সপ্তাহ পর গেরিলাদের দলটি পুনরায় সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে বাংলােেশ প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

বেতিয়ারা শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো

শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদ

শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদ, ঢাকাস্থ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তিনি একসময় ছাত্র ইউনিয়নে যোগ নে। কলেজ ছাত্রাবস্থায় নিজ  মেধা ও যোগ্যতায় অল্পেিনই সংগঠনের নেতৃত্বের প্রথম সারিতে উঠে আসেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি সংগঠনের ঢাকা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রাবস্থায় দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক আসে। সব কিছু পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে যান সামনে। যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির  গেরিলা বাহিনীতে। যৌথ গেরিলা দলের যোদ্ধাদের রক্ষার জন্য বেতিয়ারায় অস্ত্র হাতে সবার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। অসীম সাহসী এই বীরের রক্তে বাংলার মাটি সেদিন রঞ্জিত হয়েছিল।

শহীদ বশির মাস্টার

মো. বশিরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৯ সালে। শহীদ বশির ১৯৬৪ সালে ঢাকা গভ. মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি সেন্ট্রাল ল কলেজে আইনের প্রথম পর্বের ছাত্র ছিলেন। তিনিও বেতিয়ারায় পাকসেনারে সঙ্গে গেরিলা বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধে শহী হন।

শহীদ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর

শহীদ মো. সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর ১৯৭১ সালে এমএ শেষ পর্বের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরে ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শেমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীর নেতৃত্বে বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন। মো. সিরাজুম মুনীর সাহিত্য চর্চা করতেন। ১৯৭১ সালে তাঁর ছোট গল্প ‘শিল্পী’ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিরাজুম মুনীরের দাদী, ফুপা. ফুপু এবং ফুপাতো ভাইবোনসহ  মোট ৯ জন সৈয়দপুরে শহী হন।

শহীদ শহীদুল্লাহ্ সাউদ

ঢাকার ২ নম্বর ঢাকেশ্বরী কটন মিলের কর্মচারী মো. জাবেদ আলী সাউদ ও মোসাম্মৎ জাবেদা খাতুনের চার সন্তানের মধ্যে শহীদুল্লাহ সাউদ ছিলেন তৃতীয়। গোদানাইল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন গোদানাইল হাই স্কুলে। এরই মধ্যে তিনি জড়িয়ে যান ঝিলিমিলি খেলাঘর আসরের সাথে। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ছাত্র ইউনিয়ন শুরু করেন। শহীদুল্লাহ সাউদ যখন ক্লাস নাইনের ছাত্র তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে শেকে ভালোবেসে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধে যাওয়ার পরেও বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তিনি বাড়ির সবাইকে কেবলই জানাতেন, ‘ভাল আছি, কাজ শেষ হলেই ফিরব’। অসীম সাহসে লড়াই করতে করতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারায় আরও ৮ জন সহযোদ্ধার সঙ্গে তিনিও শহী হন। তিনি বেতিয়ারা যুদ্ধে কনিষ্টতম শহীদ। 

শহীদ আব্দুল কাইউম
শহীদ আব্দুল কাইউম, পিতা- মৃত ছানাউল্লাহ মিয়া, মাতা- মৃত হালিমা খাতুন, গ্রাম- চর শোলাদি, থানা- হাইম চর, জেলা- চাঁদপুর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ শিক্ষার্থী ছিলেন। শেমাতৃকার ডাকে তিনি গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেন। বেতিয়ারার অন্যান্য শহীদের সঙ্গে তিনিও পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে শহী হন।

শহীদ আওলাদ হোসেন

শহীদ আওলাদ হোসেনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনাচড়া গ্রামে। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসির ছাত্র। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানেও তিনি সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালে বেতিয়ারায় সম্মুখ সমরে শহীদ হন। তার বাবা আলমাছ উদ্দিন খান ছিলেন দোকানদার। 

শহীদ আব্দুল কাদের

কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী স্টেশনের নিকটবর্তী সাতবাড়িয়া গ্রামের সন্তান আব্দুল কারে। ১৯৭১ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে দেশের অভ্যন্তরে রণক্ষেত্রে নিরাপদে পৌঁছে ওেয়ার দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীকে স্বদেশে পৌঁছে ওেয়ার সময় কুমিল্লার বেতিয়ারায় পাকসেনাদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে শহীদ হন।

শহীদ মোহাম্মদ শফিউল্লাহ

নোয়াখালীর সাহসী সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসেন এবং নিজ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলেন। মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য তিনি গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে এই বীর দেশপ্রেমিক বেতিয়ারায় শহী হন।

শহীদ জহিরুল হক ভূঁইয়া (দুদু মিয়া)

কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয় শহীদ জহিরুল হক ভূঁইয়া (দৃদু মিয়া) অল্প বয়সেই তাঁর বাবাকে হারান। জীবিকার্জনের তাগিতে তিনি শৈশব থেকেই কৃষিকাজ করতেন। কিছুদিন কোহিনুর জুট মিলে কাজ করার সময় তিনি শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠেন। পশ্চিমা শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা, শ্রমিক নেতাদের বক্তব্যে শুনে তাঁর মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাই পরবর্তীতে রায়পুরা থানার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ড সক্রিয় ও স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে অংশগ্রহণ করতেন।

জহিরুল হক ভূঁইয়া অত্যন্ত পেশিবহুল এবং সুঠামহেী ছিলেন। তিনি বেতিয়রায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীর অগ্রগামী গেরিলা দলের সদস্য ছিলেন। পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনিও শহী নিজামউদ্দিন আজারে সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে নেন। শত্রুবাহিনীর সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে যান। শত্রুরা তাকে উর্দুতে বলতে বলেছিলেন, ‘বোলো, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। দুদু মিয়া উচ্চস্বরে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা।’

বর্তমানে বেতিয়ারা
১৯৭১ সালের ২৮ নভেম্বর চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথীঘি অঞ্চল শত্রু ‍মুক্ত হয়। সহযোদ্ধারা এই বীর-শহীরে কবরের ওপর স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় বেতিয়ারা গ্রামটি মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে তেমন পরিচিতি ছিল না। আজ  দেশ-বিদেশের অনেকের কাছেই নামটি পরিচিত। এখানে অবস্থিত শহীদরে গণকবর ও স্মৃতিসৌধটি পথিককে অশ্রুসিক্ত করে তোলে এবং সবাই আজ বেতিয়ারাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাসড়ক পুনর্নির্মাণ কালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে গণকবরটি পাকা করে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর বেতিয়ারা দিবসে ‘বেতিয়ারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’ এর উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে।

লেখক :

হাবীব ইমন

প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সাবেক সভাপতি, ঢাকা মহানগর।

তথ্যসূত্র :

  • বেতিয়ারা সংকলন; প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০১১; সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জিয়াউল হোসেন জিবু
  • মূলধারা' ৭১; দ্বিতীয় সংস্করণ; পঞ্চদশ মুদ্রণ: জানুয়ারি ২০১৯; লেখক: মঈদুল হাসান; প্রকাশক: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল); অধ্যায়: ১০-১১; পৃ: ৬১-৬৯, ৭০-৭৭।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান
ইন্দোনেশিয়ায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে