আইসিডিডিআর,বির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সেমিনার
গর্ভধারণের আগেই নারীর পুষ্টি উন্নয়ন জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭:৩৫, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৮:০৪, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
আইসিডিডিআর,বি ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নারীদের গর্ভধারণের আগেই পুষ্টির উন্নয়ন জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, গর্ভাবস্থা ও নবজাতকের ভালো শারীরিক অবস্থার জন্য নারীদের পুষ্টির উন্নয়ন প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সেমিনারে এই পরামর্শ দেওয়া হয়।
আইসিডিডিআর,বি তাদের মহাখালীর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ‘দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে পুষ্টি গবেষণার অর্ধ-শতাব্দীর যাত্রা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কূটনীতিক, গবেষক, অ্যালামনাই, উন্নয়ন সহযোগী এবং আইসিডিডিআর,বি–র কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের জীবনরক্ষাকারী গবেষণার দীর্ঘ পথচলাকে সম্মান জানান।
সবাইকে প্রতি স্বাগতকে জানিয়ে আইসিডিডিআর,বি–র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ আইসিডিডিআর,বি–র দীর্ঘদিনের সহযোগী দাতা, অ্যালামনাই, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও অংশীদারদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গবেষণাপত্র প্রকাশ নয়; বরং সেইসব গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা। এসব প্রভাব তৈরি সম্ভব হয়েছে আমাদের বিজ্ঞানী, ল্যাব, হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও দাতা দেশগুলোর সমর্থনের পাশাপাশি স্থানীয় দাতাগোষ্ঠী, শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান অবদানের মাধ্যমে।”
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের অনুপস্থিতিতে তার বক্তব্য পাঠ করেন দূতাবাসের সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট সুষ্মিতা খান। বার্তায় উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র আইসিডিডিআর,বি–র পাশে আছে, এবং এই অংশীদারত্ব গবেষণার অগ্রগতি, বৈশ্বিক নীতি প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিবৃতিতে ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন রোগতত্ত্ব নজরদারি, প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ ও টিকা গবেষণায় আইসিডিডিআর,বি–র অবদানের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট গ্লোবাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি’র অধীনে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, আইসিডিডিআর,বি–র বিশ্বমানের গবেষণা এবং সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের অনন্য সমন্বয়ের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, কানাডার সঙ্গে আইসিডিডিআর,বি–র দীর্ঘ অংশীদারিত্ব কানাডার জন্য জাতীয় গৌরব। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য সমস্যা আজকের পৃথিবীতে কানাডা ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক।”
শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ–এর জর্জ জি. গ্রাহাম প্রফেসর অব ইনফ্যান্ট অ্যান্ড চাইল্ড নিউট্রিশনের অধ্যাপক কিথ পি. ওয়েস্ট জুনিয়র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশে তার কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি পাঁচ দশকের গবেষণায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী অনুপুষ্টির ঘাটতি, মাতৃ পুষ্টি এবং শিশুর বেঁচে থাকার বিষয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
অধ্যাপক ওয়েস্ট বাংলাদেশে পরিচালিত তার গবেষণা–প্রকল্প ‘জীবিত’সহ একাধিক গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে বলেন, গর্ভধারণের আগেই নারীদের পুষ্টির উন্নয়ন সুস্থ গর্ভাবস্থা ও নবজাতকের ভালো শারীরিক অবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরী।
বাংলাদেশে ‘জীবিত’ ট্রায়াল থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে অধ্যাপক ওয়েস্ট উল্লেখ করেন যে, যেসব নারীরা গর্ভধারণের আগে এমএমএস শুরু করেন, তাদের গর্ভাবস্থা শুরু হওয়ার পরেই সাপ্লিমেন্টেশন শুরু করা নারীদের তুলনায় প্রাথমিক গর্ভপাতের হার প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পায়।
তিনি উল্লেখ করেন যে, যেসব প্রেক্ষাপটে অনুপুষ্টির ঘাটতি ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে, সেখানে প্রাথমিক পুষ্টি সহায়তা গর্ভাবস্থার ফলাফল উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ওয়েস্ট তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বাংলাদেশের প্রথম সংস্করণের মানচিত্র, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) প্রস্তুতের একটি প্রাথমিক পরিমাপযন্ত্র এবং কয়েকটি ঐতিহাসিক বই স্মারক হিসেবে ড. তাহমিদ আহমেদকে উপহার দেন।
দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে এই বছর আইসিডিডিআর,বি-র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়। প্রথম দিনে ২৬ নভেম্বর, আয়োজন করা হয় আনন্দমেলা, যেখানে বিভাগীয় প্রদর্শনী ও বিভিন্ন স্টলে কর্মীরা কারুশিল্প, পোশাক, খাদ্যসামগ্রী প্রদর্শন করেন এবং গবেষণা দলগুলো নিজেদের গবেষণার প্রভাব ও উদ্ভাবন উপস্থাপন করেন।
প্রথম দিনের উদযাপনটি আইসিডিডিার,বি-র কর্মীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
২৭ নভেম্বরের সেমিনারের মধ্য দিয়ে উদযাপন অব্যাহত থাকে, যার মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব আবারও তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠার ৬৫তম বছরেও আইসিডিডিআর,বি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য অঙ্গনে প্রতিনিয়ত অবদান রেখে চলেছে। সম্প্রতি টাইম–এর ‘বেস্ট ইনভেনশনস’ তালিকায় সামাজিক প্রভাব সৃষ্টিকারী উদ্ভাবনের জন্য স্বীকৃতি পাওয়া এবং টাইম হেলথ ১০০ তালিকায় নির্বাহী পরিচালকের অন্তর্ভুক্তি তার প্রমাণ।
এই উদযাপন প্রমাণ করেছে যে প্রমাণনির্ভর গবেষণা অগ্রগতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের জীবনের মানোন্নয়নে আইসিডিডিআর,বি চির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
