বিএমইউতে গোলটেবিল বৈঠক
৩ কারণে ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯:২৭, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
বিএমইউতে গোলটেবিল বৈঠক। ছবি: সমাজকাল
ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ) প্রতিরোধে চিকিৎসকরা ধূমপান, বায়ুদূষণ ও ইনডোর স্মোক নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা বলেছেন, এই রোগে ফুসফুসের বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বিশেষ করে শ্বাস ছাড়তে। কফের সাথে অবিরাম কাশি হওয়াও এই রোগের সাধারণ উপসর্গ। এ ছাড়া বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করা, শ্বাস নেওয়ার সময় শিস বা বাঁশির মতো শব্দ হওয়া এবং হাঁটাচলা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা দীর্ঘক্ষণ কথা বলাও কঠিন হতে পারে।
চিকিৎসকরা এই রোগের জন্য মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো- ধূমপান, বায়ু দূষণ ও রান্না বা অন্যান্য কাজের জন্য ব্যবহৃত জৈব জ্বালানি থেকে নির্গত ধোঁয়া।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিশ্ব সিওপিডি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য জানানো হয়। বিএমইউর বক্ষব্যাধি (রেসপিরেটরি) বিভাগ ‘সিওপিডি: দি হিডেন পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম বলেন, সিওপিডি প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সিওপিডি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় গাইডলাইন ও নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। সিওপিডি নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, সিওপিডি এখন বাংলাদেশের একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট। ধূমপান, বায়ুদূষণ, ইনডোর স্মোক এসব নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো সমাধান হবে না। চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় সিওপিডিকে অগ্রাধিকারে আনতে হবে। দ্রুত শনাক্তকরণ, কমিউনিটি–স্তরের স্ক্রিনিং এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চেস্ট এন্ড হার্ট এসোসিয়েশন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. মোঃ জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সিওপিডি প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সাথে গবেষণা কার্যক্রমকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সিওপিডি প্রতিরোধে ধুমপান পরিহার, বায়ুদুষণ হ্রাস করাসহ সকল ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। গ্রামে রান্নার চুলা ব্যবহারের সঠিক নিয়ম মায়েদেরকে অবহিত করতে হবে। সিওপিডির রোগীরা যাতে গাইডলাইনভিত্তিক যথাযথ চিকিৎসা পায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
আরেক উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, সিওপিডি প্রতিরোধে পরিবেশ দুষণ প্রতিরোধ, ধুমপান পরিহার অপরিহার্য। উন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউর রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, সিওপিডি প্রতিরোধযোগ্য। একসাথে কাজ করলে এই রোগের বোঝা প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমাতে পারব। সিপিওডি মোকাবিলার জন্য সমন্বিত গবেষণা, রোগী শিক্ষা, ধূমপান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। বিএমইউ এ বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
গোলটেবিল বৈঠকে চিকিৎসকরা জানান, সিওপিডির প্রকৃত বোঝা জানতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও স্ক্রিনিং জরুরি। সিওপিডি নিয়ে জাতীয় ডাটাবেজ ও মাল্টিসেন্টার গবেষণা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নারীদের ইনডোর এয়ার পলিউশন প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও নিরাপদ রান্না পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা শিক্ষা ও ইন্টার্ন ট্রেনিংয়ে সিওপিডিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের ধূমপান প্রতিরোধেই ভবিষ্যতের সিওপিডি বোঝা কমবে। সিওপিডি ব্যবস্থাপনায় গাইডলাইনভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন ইউনিট স্থাপনও এখন সময়ের দাবি। কমিউনিটি ক্লিনিকে স্পাইরোমেট্রি চালু হলে প্রারম্ভিক রোগ নির্ণয় বহুগুণ বাড়বে।
চিকিৎসকরা জানান, বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সিওপিডি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়ছে। এ বিষয় মোকাবিলায় বিশেষ পরিকল্পনা দরকার।
চিকিৎসকরা মত দেন, সারা দেশে সিওপিডি ব্যবস্থাপনার মডেল তৈরি করা প্রয়োজন। নতুন ইনহেলার প্রযুক্তি ও রোগী শিক্ষা সিওপিডি নিয়ন্ত্রণে মূল হাতিয়ার এ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। সারা দেশে সচেতনতা ক্যাম্পেইন আরও জোরদার করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে সিওপিডি শনাক্ত করতে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালভিত্তিক সিওপিডি কেয়ার পাথওয়ে উন্নত করলে অ্যাকিউট এক্সাসারবেশন অনেক কমবে। যুবকদের ভেপিং ও স্মোকিং নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে সিওপিডি আরও বৃদ্ধি পাবে, তাই এই বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও বলেন, বাংলাদেশে সিওপিডি রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত। ধূমপান, বায়ুদূষণ ও ইনডোর স্মোক প্রধান ঝুঁকি। প্রাথমিক পর্যায়ে স্পাইরোমেট্রি অপরিহার্য। গাইডলাইনভিত্তিক চিকিৎসা ও রিহ্যাবিলিটেশন জীবনমান উন্নত করবে। কমিউনিটি পর্যায়ে স্ক্রিনিং প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও জাতীয় সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডা. মানাল মিজানুর রহমান। আলোচনায় আরও অংশ নেন- বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল কাদের, অধ্যাপক ডা. কাজী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আদনান ইউসুফ চৌধুরী, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাষ্টের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. গোলাম সারোয়ার লিয়াকত হোসেন ভূঁইয়া, বিএমইউর রেসপিরেটরি বিভাগের ডা. রাজশিস চক্রবর্তী প্রমুখ।
