র্যাব ১৫: ইয়াবাকাণ্ডেই ৬৩৪ জনকে একযোগে প্রত্যাহার!
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪:৪৯, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
র্যাব-১৫ সদর দপ্তর কার্যালয়। ফাইল ছবি
কক্সবাজার ও বান্দরবানে দায়িত্বপ্রাপ্ত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-১৫) ৬৩৪ জনকে একযোগে প্রত্যাহারের পেছনে ইয়াবাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তবে, এটিকে নিয়মিত বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
র্যাব সদর দপ্তরের পাঁচটি পৃথক আদেশে ব্যাটালিয়নের সকল স্তরের ৬৩৪ জনকে এমন গণপ্রত্যাহার ও বদলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কামরুল হাসানের অনুমোদনক্রমে উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মেজর ফয়সাল আহমেদ স্বাক্ষরিত ১৯ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ জন সদস্যকে ও একই দিন আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ২০০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়। পৃথক প্রজ্ঞাপনে ১২ নভেম্বর ৬২ জনকে, ১৭ নভেম্বর ১০০ জনকে এবং ২৭ নভেম্বর আরও ৭৪ জন র্যাব সদস্যকে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়।
ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (কমান্ডিং অফিসার-সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে সংযুক্ত করা হয়েছে সদর দপ্তরে। নতুন অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নেয়ামুল হালিম খান। পাশাপাশি তিন শতাধিক র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করে অন্য ইউনিটে কর্মরতদের কক্সবাজার বদলি এবং তিন শতাধিক সদস্যকে কক্সবাজার থেকে অন্য ইউনিটগুলোতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এটিকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ বলে র্যাবের পক্ষে দাবি করা হলেও অভিযোগ উঠেছে, ইয়াবা সংক্রান্ত অবৈধ প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকায় র্যাব-১৫ এর সিওকে ক্লোজড ও সদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়।
বাহিনীটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, র্যাবের সব কর্মকর্তারই নিজস্ব এফএস (ফিল্ড স্টাফ) থাকে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার মতো তারা সিভিল টিম হিসেবে কাজ ও তথ্য সরবরাহ করেন। কক্সবাজারে কথিত এই সিভিল টিমই ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ চোরাকারবারিদের সাথে যোগাযোগ, অপরাধীদের সহায়তা ও বখরা নিয়ে ভাগ–বাটোয়ারা করে আসছিলেন। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগেই প্রত্যাহার করা হয়েছে র্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুলকে। একই সাথে বদলি করা হয়েছে বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা টু-আইসিসহ সব কর্মকর্তাকে।
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় র্যাবের অপারেশন নিয়ে নানা সন্দেহ-সংশয় রয়েছে এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝেও। সর্বশেষ কয়েকদিন আগে কুতুবপালং র্যাব ক্যাম্পের কর্মকর্তা পুলিশের ৩০ ব্যাচের কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নগদ ৬০ লাখ টাকা ও চার লাখ ইয়াবা আটকের পর ভাগ–বাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইয়াবা জব্দের পর এই মামলায় গণনায় কম দেখানো ও আর্থিক কেলেঙ্কারির এই অভিযোগে বাহিনীটির অভ্যন্তরীণ তদন্তও চলছে।
এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর উখিয়ার কুতুপালং পশ্চিমপাড়ায় র্যাব অভিযান চালিয়ে দুই নারীকে ৮৯ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ আটক দেখায়। নগদ ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৮৩০ টাকা জব্দের কথাও বলা হয়। মামলাটিতে যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিনসহ আটজনকে পলাতক দেখানো হয়। ঘটনাটি ঘিরে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ইয়াবা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
নভেম্বরের শুরুতে র্যাব সদর দপ্তরের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক যুবক জানান, কয়েকদিন আগে র্যাবের কয়েকজন সদস্য তদন্তে এসেছিলেন। তারা সেলিম ও হেলালের খোঁজ নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের মতে, সেলিম নামে দুইজন আছেন, একজন ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত এবং অন্যজন সাংবাদিক। তবে, এলাকায় তাদের সুনাম আছে। তাদের বিরুদ্ধে কখনও অন্য কোনো খারাপ অভিযোগ শোনা যায়নি।
তথ্য বলছে, আরেকটি বিতর্কিত অভিযান হয় ২৬ সেপ্টেম্বর হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায়। ডজন মামলার আসামি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার দেখায় র্যাব–১৫। তবে জব্দ তালিকায় মাত্র সাতটি ইটের টুকরা ও দুটি কাঠের লাঠি দেখানো হয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
দুই অভিযানেরই নেতৃত্বে ছিলেন তখনকার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টেকনাফ এফএস কমান্ডার কর্পোরাল ইমামকেও এসব অভিযানের নেপথ্যের ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করছেন র্যাবের একাধিক সূত্র।
তবে, র্যাব সদর দপ্তরের মিডিয়া উইং-এর পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেকাব চৌধুরী দাবি করেছেন, প্রত্যাহার হওয়া সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল এক বছরেরও বেশি সময় কক্সবাজারে কর্মরত ছিলেন। তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত কয়েকদিনে ছয় শতাধিক কর্মকর্তা ও সদস্যকে অন্যত্র বদলির বিষয়টিও নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ।
র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয় জড়িত থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র্যাব অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে’।
তদন্ত কমিটি হয়েছে কি না জানতে চাইলে উইং কমান্ডার ইন্তেকাব বলেন, ‘আমার জানা নেই, খোঁজ নিতে হবে’।
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে কর্মরত সব র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়নি। বিষয়টি সদর দপ্তরের অপারেশন শাখা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে’।
