শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

| ১৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

কুড়িগ্রামে জিঞ্জিরাম–ধরণীর ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

এম. এ. আজম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯:০৩, ২১ নভেম্বর ২০২৫

কুড়িগ্রামে জিঞ্জিরাম–ধরণীর ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

ভারত থেকে নেমে আসা জিঞ্জিরাম ও ধরণী নদীর তীব্র ভাঙন প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে মানুষের ঘরবাড়ি, জমি, স্কুল, মসজিদ আর বাজার। ছবি: সমাজকাল

উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রাম। ১৬টি নদ-নদীর প্রবাহ বয়ে যাওয়া এই জেলায় চার শতাধিক চর ও দ্বীপচর। চরাঞ্চলের এক প্রান্তে অবস্থিত রৌমারী উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা যাদুর চর—যেখানে ভারত থেকে নেমে আসা জিঞ্জিরাম ও ধরণী নদীর তীব্র ভাঙন প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে মানুষের ঘরবাড়ি, জমি, স্কুল, মসজিদ আর বাজার।

গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে শুধু যাদুর চর ইউনিয়নেই বিলীন হয়েছে তিন শতাধিক বাড়িঘর, কয়েক বিঘা ফসলি জমি, দুটি বিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার, হাটবাজার, মসজিদ ও কবরস্থান।

স্থানীয় মানুষের মতে—বছরের পর বছর আবেদন, নদী বৈঠক, অনুনয়–বিনয়ের পরও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) স্থায়ী উদ্যোগ নেই, বরং বন্যা মৌসুমেই দেখা যায় কিছু “দায়সাড়া জিও ব্যাগ” ফেলার চেষ্টা।

সরেজমিনে যাদুর চর ইউনিয়নের নামাপাড়া, দুবলাবাড়ি, লালকুড়া ও বকবান্ধা গ্রামে গেলে দেখা যায়—ভাঙনের ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতা।যেখানে একসময়ে ছিল ধানক্ষেত, পাকা বসতঘর, স্কুলের বাচ্চাদের কোলাহল—আজ সেখানে অনবরত ধসে পড়ছে নদীর কিনারা।

ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে জিঞ্জিরাম ও ধরণী নদীর স্রোত এতোটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠে যে এক রাতেই মুছে যায় পুরো একটি বাড়িঘর, কখনও পুরো একটি পাড়া।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে গেছেন ঘরছাড়া হতে—কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকায় কিংবা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন শহরে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন ঠেকাতে পাউবোকে নানা সময় আবেদন করলেও তারা বরাবরই নীরব বা উদাসীন।

অবশেষে চলতি বন্যা মৌসুমে যখন ভাঙনের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নেয়, তখন স্থানীয়দের উদ্যোগে বিষয়টি পৌঁছায় আরডিআরএস বাংলাদেশের ট্রোসা-২ প্রকল্প ও অক্সফাম বাংলাদেশ–এর কাছে।

এরপর বিভিন্ন “নদী বৈঠক”, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং কমিউনিটির অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ ৬০০ মিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয় ২৭টি বাঁশের বান্ডাল—যা সাময়িকভাবে স্রোত ঠেলে দিয়ে ভাঙনের গতি কিছুটা হলেও কমায়।

বকবান্ধার বাসিন্দা গুরু মিয়া (বয়স ৬০ বছরের বেশি) বলেন,“গত বন্যায় দুটো থাকার ঘর আর এক বিঘা জমি নদীতে গেল। পাউবো কোনো খবর নেয় না। আরডিআরএস না থাকলে ভিটার অর্ধেকটাও বাঁচতো না। আমাদের দরকার স্থায়ী বাঁধ—এই বান্ডালে কয়দিন আর টিকব?”

লালকুড়ার ৫০ বছর বয়সের মেন্নাজ আলী বলেন,“বান্ডালটা যদি উজানের দিকে করা যেত—ধান্দা কমতো অনেক। তবুও এটা অন্তত কিছুটা রক্ষা করেছে। কিন্তু আসছে বন্যায় আবার কি হবে—সে ভয় থেকেই যাচ্ছে।””

বকবান্ধা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাজেদুর রহমান সবুজ বলেন, “আমাদের স্কুলসহ বহু স্থাপনা ভেঙে গেছে। পাউবো শুধু কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছে—এটা সমাধান নয়। ভারতের দুটো নদীর স্রোত এসে ঠিক যেখানটায় পড়ে, সেখানেই ধস। স্থায়ী ব্লক ছাড়া রক্ষা নেই।”

যোগাযোগ করা হলে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম সমাজকালকে বলেন—“বকবান্ধায় আমরা জিও ব্যাগ ফেলেছি। স্থায়ীভাবে সিসি ব্লক দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের নেই। এলজিইডির রাস্তা যেহেতু নদীর কোল ঘেঁষে, তারা সেখানে বড় ধরনের কাজ করছে।”

জিঞ্জিরাম–ধরণী নদীর ভাঙন এখন কুড়িগ্রামের অন্যতম বড় মানবিক সঙ্কট। সাময়িক সমাধানের নামে কয়েকশ জিও ব্যাগ ফেলা বা বান্ডাল স্থাপন কখনোই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দিতে পারে না—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞ ও ক্ষতিগ্রস্তদের।

স্থানীয়দের দাবি—দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প, সিসি ব্লক ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, উজানে স্রোত পরিবর্তনে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, সীমান্ত উজানে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দুদেশের আলোচনাভিত্তিক সমাধান, চরাঞ্চলে বিকল্প পুনর্বাসন পরিকল্পনা-এগুলো ছাড়া ভাঙনের এই চক্র থামবে না।

যাদুর চরে মানুষের ঘরে ঘরে এখন একটাই প্রশ্ন—“আমরা কি আর কোনোদিন ফিরে পাবো আমাদের পৈত্রিক ভিটে?”

সরকারি উদ্যোগ যতদিন স্থায়ী না হবে, ততদিন জিঞ্জিরাম–ধরণীর স্রোত গিলে খেতে থাকবে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার নিরাপত্তা।

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু
ব্যবসায়ীদের কমফোর্ট জোন দিতে ব্যর্থ রাজনীতি: জামায়াত আমির
অবস্থার উন্নতি হলে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি
ই-রিটার্নে রেকর্ড: ২০ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল
খেলাপি ঋণ সংকট কাটাতে ১০ বছর লাগবে: গভর্নর
ফ্লাই করার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া—এভারকেয়ার থেকে জানালেন মান্না
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ বিএনপির
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নিতে এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুশফিকুলের আবেগঘণ স্মৃতিচারণ ‘আমার ব্যক্তিগত ঋণ’
‘লুটপাটকারীদের শাস্তি দিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ — মির্জা ফখরুল
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
খালেদা জিয়ার অবনতিশীল শারীরিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির গভীর উদ্বেগ
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় উপদেষ্টার পরিষদের সভায় দোয়া
তফসিল কবে জানালেন সিইসি নাসির উদ্দিন
দুটি বিতর্কিত অভিযানের পর র‍্যাব-১৫–এ ‘গণবদলি’
বেগম জিয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা: নাহিদ ইসলামের বিবৃতি
দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বললেন তারেক রহমান
ইন্দোনেশিয়ায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে