লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরে মাদারীপুরের তিন যুবক নিহত, স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ
মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮:৫৯, ২০ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৯:৩৩, ২০ নভেম্বর ২০২৫
“কইতো মা, আমরা গরীব দেইখা সবাই টেসে। আমি ইতালি জামু মা। কিন্তু তুমি যাইতে দিছি নাই… ডাহাইতরা আমার কামাইসুদ নিয়া গেছে। এহন আমারে কেডা কামাই কইরা খাওয়াইবো বাবা…”
লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরে মাফিয়াদের গুলিতে নিহত মাদারীপুরের যুবক মুন্না তালুকদারের (২২) মৃত্যুসংবাদ পেয়ে এভাবেই বুকফাটা আর্তনাদে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন তার মা রাবেয়া বেগম।
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনিয়নের পূর্ব দুর্গাবদ্দি গ্রামের এই যুবক তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। ইতালিতে পাড়ি জমিয়ে পরিবারকে স্বচ্ছল করার স্বপ্নেই দালালচক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন মুন্না। কিন্তু সেই পথই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল।
গত ১ নভেম্বর থেকে ১৮ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) তার মৃত্যুসংবাদ পরিবারকে জানানো হয়। এর পরপরই পলায়ন শুরু করে স্থানীয় দালালচক্রের সদস্যরা।
হৃদয়বিদারক দৃশ্য গ্রামে
বুধবার নিহত মুন্নার গ্রামে গিয়ে দেখা যায় শোকাবহ পরিবেশ। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে রাবেয়া বেগম বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। শোকে স্তব্ধ বাবা ইমারত হোসেন চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
স্বজনেরা জানান, এলাকার অনেকেই আগে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে গিয়ে স্বচ্ছল হয়েছেন। সেই পথ ধরে পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন মুন্না। দালাল নান্নু শেখের মাধ্যমে মাদারীপুর সদর উপজেলার আদিত্যপুর গ্রামের শিপন খানের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়; পরে আরও ৩৫ হাজার টাকা নেয় দালালরা। ৮ অক্টোবর বাড়ি ছাড়েন মুন্না।
সাগরে গুলিতে মৃত্যু তিন যুবকের
১ নভেম্বর লিবিয়া থেকে ২৬ জন বাংলাদেশিকে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হয় দলটি। পথিমধ্যে সাগরে মাফিয়াদের গুলিতে নিহত হন মাদারীপুরের তিন যুবক—মুন্না তালুকদার (২২), ইমরান খান (কুনিয়া ইউনিয়ন) ও বায়েজিত শেখ (রাজৈর পৌরসভা)।
ইমরানকে ইতালি পাঠাতে দালাল শিপন খানের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছিল। লিবিয়ায় নিয়ে পরিবারকে চাপ দিয়ে আরও ১৮ লাখ টাকা নেয় দালালরা। ইমরান ও মুন্না একই সময় গুলিতে নিহত হন। কিন্তু দালালচক্র পরিবারকে জানায় তারা “হাসপাতালে ভর্তি”।
অন্যদিকে বায়েজিত শেখ (১৮) গত ১১ নভেম্বর ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় মারা যান। তাকে নেওয়ার জন্য স্থানীয় মানবপাচারকারী এনামুলের সঙ্গে ২০ লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছিল।
স্বজনদের কান্না—বিচারের দাবি
নিহত মুন্নার বাবা ইমারত হোসেন বলেন, “জমি বিক্রি কইরা আর সুদের টাকা আনি ছেলেকে পাঠাইছিলাম। ২২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা খাইছে দালাল। ১৮ দিন কিছু জানায় নাই। এহন জানলাম ছেলে আর নাই। সংসার চলবে কেমনে? সরকারের কাছে দাবি—লাশটা যেন দেশে আনে।”
মুন্নার মামা আজিজুল হাকিম শেখ বলেন, “ভাইগ্নাকে লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন করেছে। ঠিকমতো খেতেও দেয় নাই। আমরা ভাইগ্নার লাশ চায়। দালালদের কঠোর বিচার চাই।”
ইমরান খানের পরিবারও একই অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি—শিপন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দালালি করে যুবকদের ইতালির লোভ দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সে সবসময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
পুলিশ বলছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ঘটনায় আমরা অবহিত। পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালচক্রকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
