মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত ভর্তুকি পায় না: উপদেষ্টা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭:৩৬, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
বক্তব্য দিচ্ছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। ছবি: সমাজকাল
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, ‘দেশের সামগ্রিক পুষ্টিচিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গড় হিসাবে নির্ভরতা ‘বিপজ্জনক প্রবণতা’। ধনী মানুষের আয় দিয়ে গরিব মানুষকে বিচার করবেন না। কৃষিতে আমরা ভর্তুকির কথা শুনি। কৃষির উপখাত হলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত কোনো ভর্তুকি পায় না। এ খাতেও ভর্তুকি দরকার’।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের (বিএজেএফ) চারদিনের ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা। দ্বিতীয় দিনের বিষয় ছিল 'জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ: পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণি ও মৎস্য খাত'।
বিএজেএফের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
ফরিদা আখতার বলেন, ওপরের কয়েক শতাংশ মানুষের ভোগক্ষমতার গড় তুলে ধরা হলে বাস্তবে গরিব মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিঘাটতি আড়াল হয়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক পুষ্টি–চাহিদা অজানাই থেকে যায়। দেশি প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতায়ই নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারী কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনও গ্রামীণ সাধারণ মানুষের হাতেই হচ্ছে। শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে শংকর জাত তৈরির সময় যেন দেশি জাতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায়, সেদিকেও কঠোর সতর্কবার্তা দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘জিরো হাঙ্গার’ মানে শুধু পেটভরে খাওয়া নয়, পুষ্টিমান নিশ্চিতও জরুরি। আমরা বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার সংখ্যা ১৩৭টি বলি। কিন্তু এই গড় হিসাব ধনী–গরিবের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়। ফলে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত ভোগ্যচিত্র অদৃশ্য থেকে যায়’।
গ্রামীণ খাদ্যব্যবস্থার বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, উৎপাদনকারী জেলার মানুষও অনেক সময় নিজ এলাকার দেশি মাছ খেতে পারেন না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে দেশি মাছের স্বাদ অত্যন্ত ভালো হলেও অনেক সুনামগঞ্জবাসী এখন অ্যাকুয়াকালচারের পাঙ্গাস খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বাস্তব তথ্য সাংবাদিকদের তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে অ্যাকুয়াকালচারের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করে ফরিদা আখতার বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ফিড ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এসব বিষয়ে এখনই নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশি জাতের মাছ, মাংস ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, যেগুলো রক্ষা সময়ের দাবি। পৃথিবীর অনেক দেশের যেসব প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের দেশে টিকে আছে’।
স্বাগত বক্তব্যে সাহানোয়ার সাইদ শাহীন বলেন, ‘আমরা বিএজেএফ থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকার চাই। এর মধ্যে নদীর মাছ ফেরত আনা, অযাচিত বালাইনাশক ব্যবহার কমানো, চাষের মাছের গুনগত মান রক্ষা, খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চাই’।
বিশেষ অতিথি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘নদীর মাছ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা চাষের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার কৌশল বাস্তবায়ন করছি। নিরাপদ মাছ উৎপাদন আমাদের প্রধান লক্ষ্য’।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ সাজেদুল করিম সরকার বলেন, দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে জেনেটিক উন্নয়ন, ফডার প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণায় দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও লাল তীর লাইভস্টকের নির্বাহী পরিচালক ড. কাজী ইমদাদুল হক, এসিআই এগ্রিবিজনেসেস গ্রুপের উপদেষ্টা ড. ফা হ আনসারী এবং আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী।
সম্মেলনে ব্লু ইকোনমি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী।
আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, করপোরেট ব্যক্তিত্ব, কৃষিবিদ, গবেষক এবং কৃষি, পরিবেশ, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টরা।
