‘সংস্কারহীনতার কারণে অর্থনীতি চাপে’—দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬:৫২, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বহুদিন গোপনে রাখা খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, পুঁজি সংকট—সব দুর্বলতা এখন প্রকাশ্যে চলে আসছে। বিনিয়োগ স্থবির, নীতিগত স্বচ্ছতা কম, আর প্রয়োজনীয় সংস্কারের অনুপস্থিতিতে অর্থনীতি মারাত্মক চাপে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর পল্টনের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক সাংবাদিকতা’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে অনলাইন নিউজ পোর্টাল অর্থসূচক।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, “দীর্ঘদিন ঢেকে রাখা খেলাপি ঋণের পাহাড়, প্রভিশনের গর্ত আর তারল্য সংকট—সব অসুখ এখন একে একে প্রকাশ্যে আসছে।”
তার মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। পুঁজিঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা এতটাই প্রকট যে বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোতে নেতিবাচক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ অত্যন্ত দুর্বল—উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যক্তিখাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সুদের হার, নীতি-নির্দেশনা, আর্থিক প্রণোদনার কাঠামো—কোনোটাই পরিষ্কার নয়।
তিনি বলেন, “সংস্কার ছাড়া হঠাৎ বিদেশি বিনিয়োগ ঘোষণা এবং নীতিগত অস্পষ্টতা পুরো বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।”
রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও তিনি অর্থনীতি স্থবির হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
চিহ্নিত সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তার বক্তব্য—“পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা, প্রশাসক নিয়োগ বা কিছু নিয়ম পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া—এসবের বাইরে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার কী করেছে?”
তার মতে, সংকট এত বড় যে ব্যান্ড–এইড দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন গভীরমূলে সংস্কার।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন—সংস্কার ছাড়া মাত্র ১৩ দিনে বড় বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, “নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ)–এর আড়ালে এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি করে। অংশীজনের অংশগ্রহণ ছাড়া বড় প্রকল্প টেকে না।”
পূর্ববর্তী সরকারগুলোর বৈষম্যমূলক চুক্তিতেও স্বচ্ছতা ছিল না—এ অভিযোগও করেন তিনি।
পলিসি রেট কমানোর সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনে করলেও তিনি বলেন—সংকোচনমূলক নীতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
জ্বালানি, গ্যাস, ব্যাংকিংয়ের তারল্য সংকট, করব্যবস্থা, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা—এসব খাতে সংস্কার পিছিয়ে আছে।
তিনি বলেন, “শুধু চাহিদা ব্যবস্থাপনা নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো তার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।
সবশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন—“রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন অর্থনৈতিক উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত না করে।”
দেশে এক ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক ‘ভূমিকম্প’—এমন ঝুঁকির কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করতে পারে।
