কৃষির আধুনিকায়নে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা তৈরি শেষ পর্যায়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭:৪৯, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
পেঁয়াজে–আদা। ছবি: সংগৃহীত
দেশের কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক, টেকসই ও রপ্তানিমুখী করতে ২৫ বছরের একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে সরকার। ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি, প্রযুক্তি পরিবর্তন, বাজারের চাহিদা ও উৎপাদনশীলতার বিবর্তন—সব দিক বিবেচনায় পরিকল্পনার খসড়া এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরেই মহাপরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হয়ে যাবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনে এ তথ্য দেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।
প্রথম দিনের আলোচ্য ছিল—‘কৃষির রূপান্তর: দেশীয় উপযোগী কৃষিযন্ত্র ও কৃষিপণ্য রপ্তানির চ্যালেঞ্জ’।
১৩টি মূল খাত ও ১৭ সংস্থার আলাদা রোডম্যাপ
কৃষি সচিব জানান, দেশের কৃষির ১৩টি মূল খাত—ফসল, পশুপালন, মৎস্য, কৃষিযন্ত্র, উদ্যানতত্ত্ব, উদ্ভিদ সুরক্ষা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণসহ অসংখ্য উপখাতকে সামনে রেখে মহাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। কৃষিকাজে যুক্ত ১৭টি সরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ২৫ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি কয়েকটি পাঁচ বছর মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পও থাকবে। সব প্রকল্পই বিস্তৃত গবেষণা, মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই ও বাস্তবতা মূল্যায়নের মাধ্যমে নেওয়া হবে বলে জানান সচিব।
সার ব্যবস্থাপনা সংস্কারে বছরে সাশ্রয় হবে ৩ হাজার কোটি টাকা
অনুষ্ঠানে সার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচিব বলেন, “আমরা এমন নীতি প্রণয়ন করছি যাতে প্রতি বছর দুই-তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। চলতি বছরই সাশ্রয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা।”
তিনি জানান, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের ৬০০ কোটি টাকা ফেরত গেছে সরকারি কোষাগারে, অথচ মাত্র ২০ কোটি টাকা ব্যয়েই পুরো প্রকল্প সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে—যা দক্ষ ব্যবস্থাপনার বড় উদাহরণ।
সবজি–আলুর বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সচিব বলেন, আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আগামী তিন বছরের মধ্যে আদা ও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে বড় অগ্রগতি
ব্রি–এর যান্ত্রিক ধান চাষাবাদ প্রকল্পের পরিচালক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম তার মূল প্রবন্ধে বলেন, শ্রীলঙ্কা, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশে এখন মানসম্পন্ন কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্র স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, মেকানিক প্রশিক্ষণ, সার্ভিস হাব ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষিযন্ত্র ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে ব্রি।
যে বাধায় থেমে আছে আন্তর্জাতিক মানের কৃষিযন্ত্র উৎপাদন
ব্রি–এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দুরুল হুদা বলেন,হালকা প্রকৌশল খাতের দুর্বলতা, সিএনসি–ভিত্তিক মেশিনিং প্রযুক্তির অভাব ও দক্ষ জনবল সংকট।
এসব কারণে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এখনও আন্তর্জাতিক মানের হারভেস্টার বা ট্রান্সপ্লান্টার বানাতে পারছেন না।
তিনি দুঃখ করে বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দেশে ইঞ্জিন তৈরির মতো কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়নি।”
কৃষিকে লাভজনক পেশায় রূপান্তরের দাবি
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, কৃষিকে শুধু উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে লাভজনক, সম্মানজনক ও শিক্ষিত পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি জানান, শুধুমাত্র পিকেএসএফ–এর সহযোগী সংস্থা বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করে, যার ৪০ শতাংশ কৃষিখাতে। দেশের কৃষি অর্থায়নের ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) নির্ভর।
ধান উৎপাদনে বিপ্লব—গড় ফলন যাচ্ছে ১০ টনের ওপরে
ব্রি মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার পর প্রতি হেক্টরে ১.৫–২ টন ধান উৎপাদন হতো; এখন অনেক এলাকায় ৮–১০ টন ছাড়িয়েছে। হাইব্রিড জাত ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে আগামী দিনে গড় ফলন ১০ টনের ওপরে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বড় সুযোগ
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বিশ্বে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বাজার ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার—এখানে বিশাল সুযোগ রয়েছে।
তবে তিনি কিছু বড় বাধার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৮টি দপ্তর থেকে রপ্তানির অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব স্বল্পতা। বিএসটিআইয়ের মান অনেক দেশে গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ওয়ানস্টপ সার্ভিস, দূতাবাস–নির্ভর কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্যিক কূটনীতিতে আরও জোর দিলে রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে।
